শরতের রোদ-বৃষ্টির খেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৪ হাজার থেকে ১৮ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে ওঠানামা করছে। গরম বেড়ে যাওয়ায় ১০ আগস্ট মধ্যরাতের পর ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়, যা দেশে সর্বকালের রেকর্ড। এমন পরিস্থিতিতেও উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরও জ্বালানির অভাবে দেশের মোট ২৯ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রের অর্ধেকই অলস বসে আছে। এর মধ্যে অলস বসে থাকা ২৯টি গ্যাসচালিত কেন্দ্র চালু থাকলেই জাতীয় গ্রিডে আরও ৬ হাজার ৩১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হতে পারত। অন্তত কাগজ-কলমে বলা যায়, তাতে আর লোডশেডিংয়ের প্রয়োজনই হতো না।
গত এপ্রিলে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তে শুরু করলে লোডশেডিংও বাড়তে থাকে। জুলাই মাসে এসে লোডশেডিং নিয়মিত ১ হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করতে থাকে। আর চলতি আগস্টে প্রায় প্রতিদিনই গড় লোডশেডিং ২ হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের গত ২৯ জুলাইয়ের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ওই দিন উৎপাদন হয়েছে ১৪ হাজার ৭৬১ মেগাওয়াট থেকে ১৪ হাজার ৭৯৯ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সক্ষমতার মাত্র প্রায় ৫১ শতাংশ। ওই দিন দেশে গড়ে দেড় থেকে দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল।
পর্যবেক্ষকদের মতে, বিগত সরকারের সময় উৎপাদন বৃদ্ধির নামে নির্বিচারে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অথচ কেন্দ্রগুলোতে সব সময় প্রয়োজনমতো জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও চুক্তিতে থাকায় ক্যাপাসিটি চার্জের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সরকারঘনিষ্ঠদের স্থাপিত কেন্দ্রগুলো। দেশে এখনো তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য পর্যাপ্ত কয়লার মজুত নেই, তরল জ্বালানির অভাব রয়েছে এবং গ্যাস-সংকট চরমে। কেবল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে নয়; গৃহস্থালি ও পরিবহনসহ সামগ্রিকভাবে গ্যাসের জাতীয় চাহিদার ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে।
পিডিবির উৎপাদন বিভাগের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৫২টি গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১১ হাজার ৯৩৪ মেগাওয়াট। বিদ্যুতের চরম চাহিদার মধ্যেও শুধু গ্যাসের অভাবে ২১টি কেন্দ্র সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। আর ৮টি কেন্দ্র আংশিক চালু আছে। এই ২৯টি কেন্দ্র সচল থাকলে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে আরও ৬ হাজার ৩১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হতে পারত।
পিডিবির অভ্যন্তরীণ এক পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, রক্ষণাবেক্ষণের কারণেও বন্ধ রয়েছে ১১টি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। অথচ দেশে জলবিদ্যুতের পরই সবচেয়ে সস্তায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় গ্যাস দিয়ে। বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৫ থেকে ৬ টাকার মধ্যে উৎপাদন করা যায়। কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিট ১০ থেকে ১৪ টাকা। সাধারণত বিকেল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকায় (পিক টাইম) ওই সময় সবচেয়ে ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো চালু করা হয়। এই কেন্দ্রগুলো থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম দাঁড়ায় ২৫ থেকে ৩৫ টাকা।
গ্যাস বরাদ্দ বাড়লেই কমে লোডশেডিং: আগস্টে একদিকে গ্যাস-সংকট অন্যদিকে তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে সারা দেশের মানুষ ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হয়। ছড়িয়ে পড়ে ক্ষোভ। বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ, মিছিল-সমাবেশ এমনকি বিদ্যুৎ অফিসে হামলার ঘটনাও ঘটে। চাপের মুখে সরকার ১৩ আগস্ট শিল্প ও সার কারখানা থেকে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল করার চেষ্টা করে। এতে সুফলও মেলে।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য গ্যাসের বরাদ্দ এত দিন ৭০০ থেকে ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও ১৩ আগস্ট থেকে তা অন্তত ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট বাড়ানো হয়। এখন দৈনিক ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের বরাদ্দ রয়েছে। পরিস্থিতির আলোকে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছুটা বেশি গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে।
পিজিসিবির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির পর বিদ্যুতের উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। ১৪ আগস্টের আগে যেখানে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে গড় উৎপাদন সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে ছিল, এখন তা বেড়ে সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট হয়েছে।
পেট্রোবাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৫২টি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দৈনিক ২ হাজার ৫২৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। তবে গ্যাসের ঘাটতির কারণে এই চাহিদার অর্ধেক পরিমাণ গ্যাসও সরবরাহ করা যায় না। দেশে মোট গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও স্থানীয় কূপের উৎপাদন ও এলএনজি আমদানি মিলিয়ে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা যাচ্ছে। তবে গত ২১ জুলাই থেকে এলএনজি রূপান্তরের বিভিন্ন রকম সমস্যার কারণে সরবরাহ মাত্র ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। আপাতত শিল্প, পরিবহন ও গৃহস্থালিসহ গ্যাসনির্ভর সব খাতে কার্যত হাহাকার চলছে।
পিডিবির গত বুধবারের উৎপাদন তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গ্যাসের অভাবে ঘোড়াশাল সিসিপিপি ২১০ মেগাওয়াট, ঘোড়াশাল টিপিপি ইউনিট-৫-এর ২১০ মেগাওয়াট, ঘোড়াশাল টিপিপি ইউনিট-৭-এর ৩৬৫ মেগাওয়াট, ঘোড়াশাল রিজেন্টের ১০৮ মেগাওয়াট, টঙ্গী ৮০ মেগাওয়াট, সিদ্ধিরগঞ্জ জিটিপিপি ২১০ মেগাওয়াট, সিদ্ধিরগঞ্জ (সামিট) ৩৩৫ মেগাওয়াটসহ ঢাকা জোনের ১৪টি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা জোনে ৪২০ মেগাওয়াটের চট্টগ্রাম টিপিপি ও ৪০০ মেগাওয়াটের আশুগঞ্জ সিসিপিপি (পূর্ব) বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ ছিল। ময়মনসিংহ জোনে আরপিসিএলের ২১০ মেগাওয়াট কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। খুলনা জোনে ভেড়ামারা ৪১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বন্ধ রয়েছে। একইভাবে রাজশাহী জোনে অন্তত পাঁচটি গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে এ বিষয়ে বলেন, ‘গ্যাস তথা জ্বালানিসংকট নিয়ে এখন আর লুকানোর কিছু নেই। সরকার দ্রুত আরও দুটি এলএনজি টার্মিনাল চালুর চেষ্টা করছে। কিন্তু এগুলোর কাজ শেষ করতে দুই বছর লেগে যাবে। এই মুহূর্তে এলএনজি আমদানি চালিয়ে যাওয়া ছাড়া গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর কোনো উপায় নেই।’