বিমানবন্দরের সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। ফিশিং, পাসওয়ার্ড চুরি, অননুমোদিত প্রবেশ এবং যাত্রী ও ফ্লাইট-সংক্রান্ত তথ্য চুরিসহ বিভিন্ন সাইবার হুমকি মোকাবিলায় নেওয়া হচ্ছে একাধিক পদক্ষেপ। বিমানবন্দরগুলোকে ইতিমধ্যে ‘ক্রিটিক্যাল ইনফরমেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ (সিআইআই) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার বেবিচক সদর দপ্তরে বেসামরিক বিমান চলাচলের সম্ভাব্য হুমকি ও ঝুঁকি মূল্যায়ন-বিষয়ক কমিটি ‘সিভিল অ্যাভিয়েশন থ্রেট অ্যান্ড রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট কমিটির’ (সিএটিআরএসি) দ্বিতীয় সভায় এসব তথ্য জানানো হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন সিএটিআরএসির সভাপতি ও বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, বেবিচক, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এয়ার ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই), প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) এবং পুলিশের বিশেষ শাখার প্রতিনিধিরা সভায় অংশ নেন।
সভায় বিমানবন্দরের সাইবার নিরাপত্তার বর্তমান পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিশেষ করে, ফিশিংয়ের মাধ্যমে তথ্য হাতিয়ে নেওয়া, পাসওয়ার্ড চুরি, অননুমোদিতভাবে সিস্টেমে প্রবেশ এবং যাত্রী ও ফ্লাইট-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরির মতো হুমকি মোকাবিলায় বেবিচকের গৃহীত পদক্ষেপ তুলে ধরা হয়।
বেবিচক সূত্রে সভায় জানানো হয়, দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল নিরাপত্তাব্যবস্থায় সাইবার নিরাপত্তাকে আরও গুরুত্ব দিতে ন্যাশনাল সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি প্রোগ্রাম (এনসিএপি) ও অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি ট্রেনিং প্রোগ্রামে (এটিএসপি) সাইবার নিরাপত্তার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘সিভিল অ্যাভিয়েশন সাইবার সিকিউরিটি ডিরেক্টিভস’ জারির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থার সক্ষমতা যাচাইয়ে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) ‘ই-গভ সিআইআরটি’র সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা অডিট পরিচালনার জন্য সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সম্পন্ন হয়েছে বলেও সভায় জানানো হয়। জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা (এনসিএসএ) থেকেও নিয়মিত নির্দেশনা নেওয়া হচ্ছে।
সভায় আরও জানানো হয়, বিমানবন্দরগুলোকে ক্রিটিক্যাল ইনফরমেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার (সিআইআই) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো ও সিস্টেমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বেসামরিক বিমান চলাচল খাত সন্ত্রাসবাদ, সাইবার হামলা, অভ্যন্তরীণ হুমকি (ইনসাইডার থ্রেট), বিস্ফোরক ডিভাইস (আইইডি), ড্রোন হামলাসহ বহুমাত্রিক নিরাপত্তাঝুঁকির মুখোমুখি। এসব হুমকি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার আইসিএও অ্যানেক্স ১৭ অনুযায়ী নিয়মিত নিরাপত্তাঝুঁকি মূল্যায়নে সিএটিআরএসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ইতিমধ্যে সিভিল অ্যাভিয়েশন রিস্ক কনটেক্সট স্টেটমেন্ট (সিএআরসিএস) চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের পদ্ধতিও নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
সভায় আসন্ন আইসিএও ইউনিভার্সাল সিকিউরিটি অডিট প্রোগ্রাম (ইউস্যাপ)–কন্টিনিউয়াস মনিটরিং অ্যাপ্রোচ (সিএমএ) অডিটের প্রস্তুতি নিয়েও আলোচনা হয়। বেবিচক চেয়ারম্যান বলেন, সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
এদিকে বিমানবন্দরের নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় উড়োজাহাজ তল্লাশির প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণে হাইয়ার রিস্ক ডেজিগনেশন লিস্ট (এইচআরডিএল) তৈরির জন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিবর্তনশীল নিরাপত্তা-হুমকি মোকাবিলায় সময়োপযোগী গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও আন্তসংস্থা সমন্বয় জোরদারের বিষয়েও সভায় বিভিন্ন সুপারিশ উঠে আসে।
সভায় বেবিচকের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমডোর মো. আসিফ ইকবাল বলেন, বেসামরিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তা পরিবেশে কার্যকর ঝুঁকি মূল্যায়ন, যথাযথ তথ্যবিনিময় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব উদ্যোগ আইসিএওর আসন্ন নিরাপত্তা অডিট সফলভাবে মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
সভায় সিএটিআরএসির প্রথম বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে কমিটির পরবর্তী সভা আয়োজনের সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।