দেশের পাঁচ জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত থেকে আজ শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ফেনী, বগুড়া, যশোর, কুষ্টিয়া ও গোপালগঞ্জ জেলায় এসব দুর্ঘটনাগুলো ঘটে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে ফেনীতে। সেখানে পৃথক দুটি দুর্ঘটনায় চারজন নিহত হয়েছেন।
ফেনীতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পৃথক দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় চারজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও পাঁচজন। আজ শুক্রবার সকালে ছাগলনাইয়ার মুহুরীগঞ্জ ও মহিপাল এলাকায় দুর্ঘটনা দুটি ঘটে।
নিহতরা হলেন—কাভার্ডভ্যানের চালক চট্টগ্রামের বোটবাজার মইজ্জারটেক এলাকার মৃত সফর আলীর ছেলে আব্দুর রহিম (৫০), বাসচালক কেরানীগঞ্জের পারগেন্ডারিয়া এলাকার সফি মিয়ার ছেলে আবুল হোসেন (৬২) এবং মহিপালের দুর্ঘটনায় নিহত চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার জয়নন্দীপুর এলাকার আবদুল হাকিমের ছেলে তাবারক আলী ফটিক (৫৬)। নিহত ও আহত অন্যদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
হাইওয়ে পুলিশ জানায়, সকাল ৭টার দিকে ছাগলনাইয়ার মুহুরীগঞ্জ দৌলতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে একটি কাভার্ডভ্যান মহাসড়কে দাঁড়িয়ে ছিল। সেটি সরিয়ে নিতে চালক ও হেলপার একটি লং ভেহিক্যালের সহায়তা নিচ্ছিলেন। এ সময় লং ভেহিক্যালের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় থাকা কাভার্ডভ্যানটিকে সরানোর সময় ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী ইউনিক পরিবহনের একটি বাস দ্রুতগতিতে এসে সেটির পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয়।
এতে কাভার্ডভ্যানের চালক, হেলপার ও ইউনিক পরিবহনের বাসচালক গুরুতর আহত হন। তাঁদের উদ্ধার করে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তিনজনকেই মৃত ঘোষণা করেন। আহতদের মধ্যে একজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
এদিকে সকাল সোয়া ৮টার দিকে মহিপাল এলাকায় একটি বাসের পেছনে কাভার্ডভ্যানের ধাক্কায় তাবারক আলী ফটিক নামে এক যাত্রী নিহত হন।
পুলিশ জানায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে চট্টগ্রামগামী পাতা পরিবহনের বাসটি মহিপাল ফ্লাইওভারের উত্তর পাশে যাত্রাবিরতি দেয়। এ সময় কয়েকজন যাত্রী বাস থেকে নেমে সড়কের পাশে অবস্থান করছিলেন। তখন দ্রুতগতির একটি কাভার্ডভ্যান বাসটির পেছনে ধাক্কা দিলে ফটিক বাসটির সামনে চাপা পড়েন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
ফেনী জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. গোলাম নবী জানান, পৃথক দুর্ঘটনায় মোট আটজনকে হাসপাতালে আনা হয়। তাঁদের মধ্যে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত চারজনের মধ্যে তিনজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামে পাঠানো হয়েছে।
ফাজিলপুর হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক আবু নোমান জানান, দুর্ঘটনাকবলিত বাস, কাভার্ডভ্যান ও লং ভেহিক্যাল পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। নিহতদের পরিচয় শনাক্তে পিবিআই কাজ করছে।
বগুড়া
বগুড়ার শিবগঞ্জে এক নারী পথচারীকে বাঁচাতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে জনপ্রশাসন ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং জয়পুরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল বারীকে বহনকারী গাড়ি। এ ঘটনায় গুরুতর আহত পথচারী ফিরোজা বেগম (৫৫) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
আজ শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে মোকামতলা-জয়পুরহাট সড়কের শিবগঞ্জ উপজেলার গোপীনাথপুর এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত ফিরোজা বেগম শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক ইউনিয়নের গোপীনাথপুর গ্রামের মৃত নিজাম উদ্দিনের স্ত্রী।
শিবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিনুজ্জামান দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
যশোরে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় দুই নারীসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। আজ শুক্রবার সকাল ও দুপুরে যশোর-খুলনা ও যশোর-চুকনগর মহাসড়কে এসব দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন—অভয়নগর উপজেলার মশরহাটি গ্রামের হাকিম গাজীর ছেলে আমজেদ গাজী, একই উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের আব্দুল মালেকের স্ত্রী আসিরন বিবি এবং কেশবপুর উপজেলার মধ্যকুল গ্রামের রেজাউল ইসলামের স্ত্রী রোকেয়া বেগম।
পুলিশ জানায়, শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে যশোর-খুলনা মহাসড়কের উড়োতলা এলাকায় গড়াই পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেলচালক আমজেদ গাজী নিহত হন। এ সময় মোটরসাইকেলে থাকা আসিরন বিবি গুরুতর আহত হন। প্রথমে তাঁকে অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনায় নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
নওয়াপাড়া হাইওয়ে থানার এসআই আমিনুল ইসলাম জানান, দুর্ঘটনায় জড়িত গড়াই পরিবহনের বাসটি আটক করা হয়েছে। তবে চালক ও হেলপার পালিয়ে গেছেন। তাঁদের আটকের চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে, শুক্রবার সকাল ৭টার দিকে কেশবপুরে বাসের চাপায় রোকেয়া বেগম (৪৫) নামে এক নারী নিহত হন। যশোর-সাতক্ষীরা সড়কের মধ্যকুল উত্তরপাড়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, ফজরের নামাজের পর সকালে হাঁটতে বের হয়েছিলেন রোকেয়া। যশোরগামী স্টার ডিলাক্স পরিবহনের একটি যাত্রীবিহীন বাস তাঁকে চাপা দেয়। এরপর বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে থাকা মাদ্রাসা ও এতিমখানার সামনের অংশে ঢুকে পড়ে। এতে বাসের সহকারী মানিক ফকির আহত হন।
কেশবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রেকসোনা খাতুন জানান, রোকেয়া বেগমের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য যশোর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। বাসটি থানা হেফাজতে রয়েছে।
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের রেলিংয়ে ধাক্কা লেগে দুই কিশোর নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় আরও একজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিসৌধ কমপ্লেক্সের সামনের সড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলো—কুমিল্লার হোমনা উপজেলার মোহাম্মদ আল আমিনের ছেলে স্কুলছাত্র আল রাফি (১৪) এবং ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার দেওরা গ্রামের মো. আফজালের ছেলে ইয়াসিন (১৭)। ইয়াসিন টুঙ্গিপাড়ার গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তিনজন একটি মোটরসাইকেলে করে অতিরিক্ত গতিতে উপজেলা মোড় থেকে পাটগাতী বাসস্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছিলেন। সমাধিসৌধ কমপ্লেক্সের সামনে পৌঁছালে চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে মোটরসাইকেলটি সড়কের পাশের রেলিংয়ে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে তিনজনই গুরুতর আহত হন।
স্থানীয়রা তাঁদের উদ্ধার করে টুঙ্গিপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসক আল রাফিকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে গুরুতর আহত ইয়াসিনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে শুক্রবার দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
টুঙ্গিপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আইয়ুব আলী জানান, দুই পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মরদেহ দুটি তাঁদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ বা মামলা হয়নি।
কুষ্টিয়া
কুষ্টিয়ার মিরপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় আব্দুল লতিফ মালিথা (৬৫) নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। আজ শুক্রবার বেলা ১টার দিকে কুষ্টিয়া-মেহেরপুর মহাসড়কের খয়েরপুর বাজার এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত আব্দুল লতিফ মালিথা খয়েরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক এবং স্থানীয় মৃত সাবান মালিথার ছেলে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জুমার নামাজ আদায়ের উদ্দেশে বাইসাইকেলে করে মসজিদে যাচ্ছিলেন আব্দুল লতিফ। খয়েরপুর বাজার সংলগ্ন মহাসড়ক পার হওয়ার সময় দ্রুতগতির একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা তাঁকে ধাক্কা দেয়। এতে তিনি সড়কে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে মিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলার প্রতিনিধিরা।