জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ আইনের খসড়ায় কিছু ইতিবাচক সংশোধনের প্রস্তাব এলেও স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত তদন্তের সুযোগ তৈরি হয়নি বলে মনে করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, বিশেষ করে শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা সীমিত রাখায় তদন্তের কর্তৃত্ব কার্যত অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের হাতেই থেকে যাচ্ছে।
আজ বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে টিআইবি বলেছে, জাতীয় সংসদের সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬ এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬ পর্যালোচনা করে কয়েকটি ইতিবাচক সংশোধনের প্রস্তাব করেছে। তবে গুমসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার মৌলিক ঘাটতিগুলো রয়ে গেছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কমিশন সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের আওতাধীন হবে না-এমন সুস্পষ্ট বিধান না থাকা, সরকারি কর্মচারীদের কমিশনার হওয়ার সুযোগ এবং বাছাই কমিটিতে স্পিকার, মন্ত্রী, সরকারি দলের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব রাখার কারণে কমিশনের ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রভাবের ঝুঁকি রয়েছে।
সংস্থাটির পরিচালকের মতে, কমিশনের মোট জনবলের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সরকারি কর্মচারী প্রেষণে নিয়োগ এবং ব্যয় ও বরাদ্দ ব্যবহারে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক স্বাধীনতার সুরক্ষা না থাকায় স্বাধীন মানবাধিকার কমিশনের প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলের ধারা ১৯ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটির দাবি, শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে কমিশন নিজে সরাসরি অনুসন্ধান ও তদন্ত না করে সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের কাছেই প্রতিবেদন চাইবে-এমন ব্যবস্থা বহাল রাখা হয়েছে। এতে কমিশনের তদন্তের ক্ষমতা আরও সংকুচিত হয়েছে এবং এটি প্যারিস নীতিমালার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে বলে মনে করছে টিআইবি। সংস্থাটির ভাষ্য, অভিযুক্ত বাহিনীকে নিজ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত থেকে বিরত রাখার প্রস্তাব থাকলেও অন্য শৃঙ্খলা বাহিনী বা আন্তবাহিনী তদন্ত দলের মাধ্যমে তদন্তের সুযোগ রাখা হয়েছে। অতীতে গুমের ঘটনায় বিভিন্ন শৃঙ্খলা, পুলিশ, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকায় এমন তদন্ত কতটা স্বাধীন হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবে তদন্ত দুর্বল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হলে শুধু ন্যায়বিচার ব্যাহত হবে না, ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবার ক্ষতিপূরণ, গুমের শিকার হিসেবে স্বীকৃতি এবং সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত অধিকার থেকেও বঞ্চিত হতে পারেন।
গুমের সংজ্ঞা আরও পূর্ণাঙ্গ করার দাবি জানিয়েছে টিআইবি। আন্তর্জাতিক সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি কর্মচারী ও শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্ভাব্য সম্পৃক্ততাও সংজ্ঞার আওতায় আনার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
এ ছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া বা তাঁর পরিণতি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অনুসন্ধান অব্যাহত রাখা এবং পরিবারকে নিয়মিত অগ্রগতি জানানোর বিধান রাখার দাবি জানিয়েছে টিআইবি। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের তুলনায় গুমের অপরাধের সাজা কমানোর বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে তারা।
টিআইবি জানিয়েছে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়ে তারা ২৫ দফা এবং গুম প্রতিরোধ বিল নিয়ে ১৭ দফা সুপারিশ দিয়েছিল। সংসদীয় কমিটির পর্যালোচনাকে বিল দুটির মৌলিক দুর্বলতা সংশোধনের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ উল্লেখ করে সংস্থাটি বলেছে, বিল দুটি তড়িঘড়ি কণ্ঠভোটে পাস না করে প্রতিটি ধারা নিয়ে সংসদে অর্থবহ আলোচনা করা উচিত।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিজ্ঞতা, ভুক্তভোগীদের অধিকার এবং অংশীজনদের সুপারিশ প্রতিফলিত করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের পরই বিল দুটি পাস করা উচিত বলে মনে করে টিআইবি।