মামলা করার আগে বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় আদালতে নতুন মামলা দায়েরের সংখ্যা ৬২ দশমিক ০২ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। এই উদ্যোগকে আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের দীর্ঘদিনের মামলার জট নিরসনে বড় ধরনের অগ্রগতি সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তিনি।
আজ মঙ্গলবার আইন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষ থেকে ভার্চুয়ালি ১০টি জেলায় মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী।
বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, পটুয়াখালী, ভোলা, নাটোর, যশোর, শরীয়তপুর, কক্সবাজার, পঞ্চগড় ও টাঙ্গাইল জেলায় মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন আইনমন্ত্রী। এর ফলে এখন থেকে এসব জেলায় ৭টি আইনের ক্ষেত্রে আদালতে মামলা করার আগে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আসাদুজ্জামান বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ মামলা বিচারাধীন, যা বিচারব্যবস্থার ওপর একটি বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। এ বাস্তবতায় আদালতে মামলা করার আগেই বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলে বিচারপ্রার্থীর সময়, অর্থ ও ভোগান্তি কমবে এবং আদালতের ওপর চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
আইনমন্ত্রী আরও জানান, একটি পাইলট প্রকল্পের আওতায় ২০টি জেলায় প্রি-কেস মেডিয়েশন চালুর পর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে সময়ের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে বিভিন্ন আইনে মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর মধ্যে পারিবারিক আদালত আইনে মামলা ৩ হাজার ৫৫৯টি থেকে ১ হাজার ৭৪৪টিতে নেমে এসেছে। সিভিল জজ আদালতের এখতিয়ারভুক্ত বণ্টন সংক্রান্ত মামলা ২ হাজার একটি থেকে ৬৬১টিতে নেমেছে।
এ ছাড়া স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি আইনের প্রিম্পশন মামলায় ১৭টি থেকে দুটিতে, নন-এগ্রিকালচারাল টেন্যান্সি আইনে ৩১টি থেকে ১৪টিতে, যৌতুক নিরোধ আইনে ৫ হাজার ৬০৫টি থেকে ১ হাজার ৮১০টিতে, পিতামাতার ভরণ-পোষণ আইনে ৪৩টি থেকে ৩৫টিতে নেমেছে। সব মিলিয়ে গড়ে ৬২ দশমিক ২ শতাংশ মামলা দায়ের কমেছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, আদালতে মামলা করার প্রবাহ এভাবে কমানো গেলে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
বিচারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে যেগুলো আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তিযোগ্য, সেগুলো জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে মধ্যস্থতার জন্য রেফার করলে বিচারপ্রক্রিয়া আরও গতিশীল হবে।
আইনমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, আদালত, জেলা লিগ্যাল এইড অফিস, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করলে আগামী এক বছরের মধ্যে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
কক্সবাজার জেলায় বর্তমানে এক লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী জেলা জজ, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের আগামী তিন মাসে মামলাজট দৃশ্যমানভাবে কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে বলে জানান তিনি।
প্রি-কেস মেডিয়েশন কার্যক্রম বাস্তবায়নে জাইকা, জিআইজেড এবং ইউএনডিপি এর সহযোগিতার জন্য এসব উন্নয়ন সহযোগীদের ধন্যবাদ জানান আইনমন্ত্রী।
মধ্যস্থতাকারীদের উদ্দেশে আইনমন্ত্রী বলেন, এই দায়িত্বকে কেবল চাকরি হিসেবে নয়, বরং জনসেবামূলক একটি দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। তবে মধ্যস্থতা কার্যক্রমে যেকোনো ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’ বলে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মনজুর হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা বক্তব্য রাখেন। ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে যশোরের জেলা ও দায়রা জজ মাহমুদা খাতুন, কক্সবাজারের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবু সালেহ মোহাম্মদ নোমান, জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার অভিজিৎ চৌধুরী ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আবদুল মান্নান বক্তব্য রাখেন।