রাজশাহীতে সফরের সময় রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) একটি বাসে চড়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেই ছবি ফেসবুকে দেখে মন্তব্য করেছিলেন আবু বকর সিদ্দিক (২২) নামের এক যুবক। তিনি লিখেছিলেন, ‘ইস! একটা বড় সুযোগ ছিল, শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল।’ মন্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর গতকাল বুধবার বিকেলে তাঁকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
আবু বকর সিদ্দিকের বাবা আয়নাল হককেও হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। পরে তাঁদের ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত আবু বকরের বিরুদ্ধে এ ঘটনায় মামলা করার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
আজ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গতকাল বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে রাজশাহীর পবা থানার পারিলা ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে আবু বকর সিদ্দিককে আটক করা হয়। তাঁর বাড়ি রাজশাহীর চন্দ্রিমা থানার কেচুয়াতৈল গ্রামে। তাঁর বাবার নাম আয়নাল হক।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজশাহী সফর করেন। তাঁর সফরের বিভিন্ন ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে একটি ছবির মন্তব্যের ঘরে আপত্তিকর মন্তব্য করেন আবু বকর। তাঁর পরিচয় শনাক্তে রাজশাহী মহানগরের চন্দ্রিমা থানা-পুলিশ, এসআরবি, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), সিটিএসবি ও সিআরটি কাজ শুরু করে। পরিচয় শনাক্তের পর এসআরবির সদস্যরা তাঁর বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তখন আয়নাল হক জানান, তাঁর ছেলে মামার বাড়িতে আছেন।
পরে এসআরবি-৫ রাজশাহী ব্যাটালিয়নের একটি দল পবা থানার পারিলা ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর এলাকায় আবু বকরের মামার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাঁকে আটক করে।
আজ দুপুরে এসআরবি-৫-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফয়সাল ইশতিয়াক বলেন, ‘আমরা দুজনকেই ডিবির কাছে হস্তান্তর করেছি।’ তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে চাননি তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আবু বকর সিদ্দিক রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁর বাবা আয়নাল হক পেশায় কৃষক। পরিবারের চার ভাই-বোনের মধ্যে আবু বকর সবার বড়। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ভ্যানে সবজি পরিবহনের কাজ করেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এলাকায় গিয়ে জানা গেছে, আবু বকর ‘ভালো ছেলে’ হিসেবে পরিচিত। তিনি বাইকারদের একটি দলের সঙ্গে যুক্ত। দলটির সদস্যদের সঙ্গে মোটরসাইকেলে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ান। তাঁর পরিবারের সদস্যরা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলেন বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।
আবু বকরের মা আসমাউল হুসনা দাবি করেন, তাঁর ছেলে নিরীহ, পরিশ্রমী ও মেধাবী। তাঁকে এ ঘটনার সঙ্গে ফাঁসিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে আজ সকালে চন্দ্রিমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম আবু বকরের বাড়িতে তল্লাশি চালান। প্রায় এক ঘণ্টা তল্লাশি করেও জব্দ করার মতো কোনো আলামত পায়নি পুলিশ। শুধু একটি পেনড্রাইভের মোড়ক জব্দ করা হয়েছে। পুলিশ আবু বকরের ল্যাপটপ উদ্ধারের চেষ্টা করলেও তা পাওয়া যায়নি।
পরিবারের সদস্যরা দাবি করেন, আবু বকর ল্যাপটপ ব্যবহার করতেন না এবং তাঁর কোনো ল্যাপটপ নেই।
রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম বলেন, আবু বকর সিদ্দিক কলেজের নিয়মিত শিক্ষার্থী। তিনি প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা দিয়েছেন, তবে ফল প্রকাশ হয়নি। কলেজে আবু বকরের কোনো খারাপ আচরণ তাঁর চোখে পড়েনি।
শরিফুল ইসলাম আরও বলেন, ফেসবুকে মন্তব্যের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তিনি কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁদের কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন, আবু বকরের বাবা আগে আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সমর্থক ছিলেন, ৫ আগস্টের পর জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে মিশছেন। আবু বকর পারিবারিক সূত্রে ছাত্রলীগ করতেন বলেও তিনি শুনেছেন। তবে কলেজে এ বিষয়ে কোনো কিছু দেখেননি বলে জানান তিনি।
রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি মাহমুদ হাসান লিমন বলেন, ‘আমি প্রশাসনের লোকজনের কাছে শুনলাম, আবু বকর আগে ছাত্রলীগ করত। এখন নাকি ছাত্রশিবির করছে। কিন্তু কলেজে আমি কোনো কিছু দেখিনি। তাকে আমরা সেভাবে চিনতামও না।’
এ বিষয়ে ছাত্রশিবিরের রাজশাহী মহানগরের সভাপতি ইমরান নাজির বলেন, ‘এখন কিছু হলেই শিবিরের ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়ার একটা অপচেষ্টা চলছে। কিন্তু আবু বকর সিদ্দিক আমাদের কেউ না। সে অপরাধ করেছে, আমরাও তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
গত মঙ্গলবার রাজশাহী সফরে এসে বিমানবন্দর থেকে মাদ্রাসা ময়দান, সেখান থেকে ধর্মসভা হয়ে আবার বিমানবন্দরে যাতায়াতের সময় রুয়েটের বাস ব্যবহার করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় সড়কের দুই পাশে অসংখ্য মানুষ তাঁকে শুভেচ্ছা জানান। প্রধানমন্ত্রীও তাঁদের শুভেচ্ছার জবাব দেন।