মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতার সঙ্গে অন্য কোনো ভাতার তুলনা হতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান। তিনি বলেছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের জন্য ভাতা নির্ধারণ ঠিক আছে, তবে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা এক টাকা হলেও বাড়ানো উচিত।
আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
ফজলুর রহমান বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানী ভাতা ২০ হাজার টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অন্যদিকে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের—বীরশ্রেষ্ঠ, বীর উত্তম, বীর বিক্রম ও বীর প্রতীকদের ভাতা ৫ হাজার টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সময়ে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের জন্য মাসিক ২০ হাজার টাকা এবং বিভিন্ন শ্রেণির আহত ব্যক্তিদের জন্য ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা ভাতার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
ফজলুর রহমান বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানকে আমি শ্রদ্ধা করি। জুলাইয়ের শহীদ পরিবারকে ২০ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হয়েছে, এটা ঠিক আছে। আহতদের জন্যও বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাতা রাখা হয়েছে। কিন্তু কোনো কারণেই মুক্তিযোদ্ধার সম্মানী ভাতার সঙ্গে অন্য কারও সম্মানী ভাতার তুলনা হতে পারে না। যদি হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এর খেসারত দিতে হবে।’
বিএনপির এই সংসদ সদস্য বলেন, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এখনো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাঁর ভাষায়, ‘এখানে যারা বিএনপির এমপি হয়েছেন, তাঁদের ৯৯ শতাংশকেই শেষ পর্যন্ত বলতে হয়েছে—আমরা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের দল, আমরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারা বলছে, তারা জুলাইয়ের পক্ষে, সৎ নেতৃত্বের পক্ষে, সৎ রাজনীতির পক্ষে। আমি জুলাই যোদ্ধাদের অসম্মান করছি না। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে কাউকে তুলনা করলে কয়েক বছর পর এর উত্তর দেওয়া কঠিন হয়ে যাবে।’
বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে সংস্কৃতি খাতেও বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানান ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, শিক্ষা ও সংস্কৃতি একে অপরের পরিপূরক। ভাত আর তরকারির যেমন সম্পর্ক, শিক্ষা ও সংস্কৃতিরও ঠিক তেমন সম্পর্ক। একটাকে অনাহারে রেখে আরেকটাকে সুস্থভাবে এগিয়ে নেওয়া যায় না। শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির সঠিক মিলন না হলে সভ্য সমাজ গড়ে উঠবে না।
নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণ করে বিএনপির এই সংসদ সদস্য বলেন, একসময় ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক চর্চা গ্রামীণ সমাজের স্বাভাবিক অংশ ছিল। কিন্তু এখন কিছু গোষ্ঠী সংস্কৃতি ও খেলাধুলার বিরোধিতা করছে।
কারও নাম উল্লেখ না করে ফজলুর রহমান বলেন, তাদের নাটক পছন্দ না, ফুটবল খেলা পছন্দ না। বলা হচ্ছে, ফুটবল খেলা যারা দেখবে, তারা কাফের। আর্জেন্টিনার খেলা দেখা যাবে না, ব্রাজিলের খেলা দেখা যাবে না। তারা সমাজকে মধ্যযুগে ফিরিয়ে নিতে চায়, বর্বরতার দিকে নিয়ে যেতে চায়।
সংসদে ধর্মীয় সম্প্রীতির বিষয়েও বক্তব্য দেন ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, দেশের কোথাও মন্দির নির্মাণ হলে তা নিয়ে অযথা বিরোধ সৃষ্টি করার প্রয়োজন নেই। তাঁর ভাষায়, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আছেন, যদি মনে করেন, কোনো মন্দির বা মূর্তি করা ঠিক না, তাহলে আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু আমি মনে করি, ১০০টা না ৩০০টা মন্দির বানাক, আমি মুসলমান। আমার কী আসে-যায়? আমি তো ওদিকে তাকাই না। আমি প্রয়োজনে ২৫ তলা মসজিদ করব। ওরা তাদের মন্দিরে পূজা করবে, আমি আমার মসজিদে নামাজ পড়ব। অসুবিধা কী? একসঙ্গে কি আমরা থাকব না?’
আলোচনায় হাওর অঞ্চলের উন্নয়ন প্রসঙ্গও তুলে ধরেন ফজলুর রহমান। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাতিল হওয়া প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার হাওর উড়ালসড়ক প্রকল্পের সমালোচনা করে তিনি বলেন, প্রকল্পটি পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। বিকল্পভাবে কম ব্যয়ে হাওরাঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়ারও প্রস্তাব দেন তিনি। এ ছাড়া হাওর এলাকার উন্নয়নে পৃথকভাবে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান এই সংসদ সদস্য।