বাংলাদেশে চলমান ‘রাজনৈতিক উত্তেজনা’, ‘বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি’র আশঙ্কায় ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে কানাডা সরকার। দেশটির সরকারি ট্রাভেল অ্যাডভাইসরি অনুযায়ী, বাংলাদেশে ভ্রমণকারীদের উচ্চমাত্রায় সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সব ধরনের ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত কানাডার সরকারি ভ্রমণ পরামর্শে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল রয়েছে। রাজনৈতিক উত্তেজনা এখনো উচ্চমাত্রায়। বিচারিক কার্যক্রম ও রাজনৈতিক সমাবেশকে কেন্দ্র করে কোনো পূর্বসতর্কতা ছাড়াই নতুন করে বিক্ষোভ ও নাগরিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। এর ফলে পরিবহনব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং সহিংস সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে।
কানাডা সরকার বলেছে, সহিংসতা বাড়ার প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে। এর মধ্যে দেশীয়ভাবে তৈরি বিস্ফোরক বা ককটেল বিস্ফোরণ এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনাও রয়েছে।
বাংলাদেশে অবস্থানরত কানাডীয় নাগরিকদের প্রধান শহরগুলোর কেন্দ্রস্থলে নিরাপত্তা বাহিনীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি এবং যান চলাচলে বিঘ্নের জন্য প্রস্তুত থাকতে, নিরাপত্তা তল্লাশিচৌকিতে পরিচয়পত্র দেখাতে, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করতে এবং সব ধরনের বিক্ষোভ ও সমাবেশ এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে।
কানাডার সতর্কবার্তায় ঢাকার জাতীয় সংসদ ভবন ও বাংলাদেশ সচিবালয়, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মিরপুর, মতিঝিল, নয়াপল্টন, পুরানা পল্টন, উত্তরা, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শাহবাগ ও কারওয়ান বাজার এলাকায় বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে—চট্টগ্রাম, ঢাকা, খুলনা ও সিলেটসহ বিভিন্ন শহরে রাজনৈতিক সমাবেশ সহিংস রূপ নিয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক গোষ্ঠী, বিক্ষোভকারী ও পুলিশের সংঘর্ষে বিস্ফোরক ডিভাইস ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ঘটনাও ঘটেছে। হোটেল, সিনেমা হল, গণপরিবহন ও রেলস্টেশনের মতো জনবহুল স্থানেও ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস ব্যবহার করে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবাদের’ হুমকি রয়েছে বলেও সতর্ক করেছে কানাডা। বিশেষ করে ঢাকায় সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে বলা হয়েছে, উগ্রপন্থীরা অতীতে ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস ও আত্মঘাতী বোমারু ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে এবং পশ্চিমা নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ২০২০ সালের পর এ ধরনের হামলা কমলেও ছোট আকারের হামলা ও হামলার চেষ্টা এখনো ঘটছে।
সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে সরকারি ভবন, উপাসনালয়, বিমানবন্দর ও পরিবহনকেন্দ্র, পর্যটনকেন্দ্র, রেস্তোরাঁ, কফিশপ, শপিং সেন্টার, বাজার, হোটেল, পুলিশ স্টেশন এবং বিদেশিদের যাতায়াত রয়েছে এমন জনসমাগমস্থলের কথা উল্লেখ করেছে কানাডা।
পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে কানাডার সতর্কতা আরও কঠোর। ওই অঞ্চলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সহিংসতা, অপহরণ এবং বিচ্ছিন্ন জাতিগত সংঘর্ষের গুরুতর ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে কানাডীয় নাগরিকদের সব ধরনের ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া অবরোধ ও হরতালের সময় ভ্রমণ না করা, পর্যাপ্ত খাদ্য, পানি ও জ্বালানি মজুত রাখার প্রস্তুতি নেওয়া এবং সাধারণ ধর্মঘটের সময় ঢাকার বাইরে ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে কানাডা। সতর্কবার্তায় বাংলাদেশে সহিংস অপরাধ, অপহরণ, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, ছোটখাটো অপরাধ, নারী ভ্রমণকারীদের হয়রানি, ক্রেডিট কার্ড ও এটিএম প্রতারণা, অনিয়মিত বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ এবং দুর্বল পর্যটন অবকাঠামোর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের সড়ক ও গণপরিবহন নিরাপত্তা নিয়েও সতর্ক করেছে কানাডা। সড়কের অবস্থা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল, শহরাঞ্চলে যানজট বিশৃঙ্খল এবং সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত হওয়ার ঘটনা সাধারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাস, ট্রেন ও ফেরির নিরাপত্তার মানও দুর্বল বলে সতর্কবার্তায় জানানো হয়েছে। উপকূলীয় জলসীমায় জলদস্যুদের হামলা ও জাহাজে সশস্ত্র ডাকাতির ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।