হোম > জাতীয়

মাধ্যমিক স্তর: নিয়োগের আগে প্রশিক্ষণ নিতে হবে শিক্ষকদের

রাহুল শর্মা, ঢাকা 

মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক নিয়োগে বড় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগে শিক্ষক পদে নিয়োগের পর নিয়োগপ্রাপ্তরা প্রশিক্ষণের আওতায় আসতেন। এই নিয়ম পরিবর্তন করে নিয়োগের আগেই প্রার্থীদের প্রাক্‌-চাকরিকালীন প্রশিক্ষণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের পেশাদারত্ব বাড়ানোর জন্য একটি প্রকল্পের প্রাথমিক খসড়ায় এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ‎মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এই প্রাথমিক খসড়া প্রস্তাব তৈরি করেছে। প্রাথমিক হিসাবে, ‘প্রফেশনালাইজেশন ফর এনহ্যান্সড লার্নিং প্রজেক্ট’ নামের এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ২৪৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয় হতে পারে। প্রস্তাব অনুযায়ী, এই অর্থের বড় অংশই খরচ হবে কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও মেরামত এবং পেশাগত সেবা খাতে।

প্রকল্পের পুরো অর্থই বৈদেশিক অনুদান হিসেবে পাওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্য বাস্তবায়নকাল চলতি বছরের নভেম্বর থেকে ২০৩০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত।

জানতে চাইলে মাউশির পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন উইং) অধ্যাপক ড. মীর জাহীদা নাজনীন গত মঙ্গলবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, শিক্ষার মান উন্নয়নে বর্তমান সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে শিক্ষক নিয়োগের আগে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

শিক্ষাবিদেরা শিক্ষক নিয়োগের আগে প্রাক্‌-চাকরিকালীন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁরা বলছেন, এর মাধ্যমে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকতা পেশা সাধারণ চাকরির মতো না হয়ে একটি পেশাগত কাঠামোর মধ্যে আসবে। তবে এ কার্যক্রম একটি সমন্বিত নীতিমালার ভিত্তিতে পরিচালনা করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার মানে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

দেশে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক রয়েছেন মোট ২ লাখ ৪৬ হাজার ৭৮৪ জন। তাঁদের মধ্যে নারী ৭৩ হাজার ৪৯ জন। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষক মূলত দুভাবে নিয়োগ পান। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ হয় সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে। বেসরকারি পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে।

নিয়োগের পর মাউশির বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে এসব শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই প্রশিক্ষণ হয় এককালীন।

বিভিন্ন দেশে শিক্ষকতা পেশায় যোগদানের আগে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। ইউরোপের দেশ ফিনল্যান্ডে শিক্ষকতা পেশায় আসতে হলে শিক্ষাবিজ্ঞান-সংক্রান্ত অধ্যয়ন (পেডাগোজিক্যাল স্টাডিজ) সম্পন্ন করতে হয়। সিঙ্গাপুরেও প্রাক্‌-চাকরিকালীন শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশের জন্য লাইসেন্স নিতে হয়।

‎প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত সোমবার বিশ্ব শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে বলেছেন, শিক্ষকতা কোনোভাবেই ‘উপায়হীন বিকল্প’ বা সাধারণ চাকরির মতো পেশা হতে পারে না। শিক্ষাদীক্ষায় সবচেয়ে মেধাবীরা যাতে কর্মজীবনে শিক্ষকতাকেই প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেন, সে লক্ষ্যে সরকার শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাচ্ছে।

‎‘প্রফেশনালাইজেশন ফর এনহ্যান্সড লার্নিং প্রজেক্ট’ নামের ‎প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে প্রকৃত প্রাক্‌-চাকরিকালীন (প্রি-সার্ভিস ট্রেনিং) প্রশিক্ষণের সুযোগ নেই। কিন্তু শিক্ষকতার মতো পেশায় প্রবেশের আগে প্রয়োজনীয় পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন এবং মানসিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রকল্পের প্রস্তাবে ‎যোগ্য ব্যক্তিদের শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশের সুযোগ দিতে প্রাক্‌-চাকরিকালীন শিক্ষক-শিক্ষা মডেল প্রবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, এই মডেলের আওতায় পাইলট কার্যক্রম পরিচালনা এবং পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে প্রি-সার্ভিস শিক্ষক প্রশিক্ষণ মডেল চালু করা হবে। একই সঙ্গে প্রাক্‌-চাকরিকালীন শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো ও সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

‎‎জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা) ড. সরদার মো. কেরামত আলী বলেন, প্রকল্প প্রস্তাবটি বর্তমানে অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত নয়।

‎প্রকল্প প্রস্তাবে শিক্ষকদের পেশাদারত্ব বৃদ্ধিতে ‘শিক্ষক পেশাগতীকরণ নির্দেশিকা (টিপিজি)’ এবং ‘শিক্ষক পেশাগত উন্নয়ন কাঠামো (টিপিডিএফ)’ প্রণয়নের কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি চাকরিতে থাকা শিক্ষকদের জন্য অব্যাহত পেশাগত উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদারের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যমান ১০টি প্রশিক্ষণ কোর্স হালনাগাদের পাশাপাশি আরও ১০টি নতুন কোর্স চালুর কথা রয়েছে প্রকল্পের প্রস্তাবে।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান সোমবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষে পাঠানো উচিত নয়। একজন প্রার্থীর শিক্ষক হিসেবে কাজ করার মানসিক সক্ষমতা, আগ্রহ ও যোগ্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। এসব যাচাইয়ের জন্য প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। তবে সব কার্যক্রমই একটি সুস্পষ্ট শিক্ষানীতির আওতায় পরিচালনা করতে হবে।

প্রকল্পের প্রস্তাব অনুযায়ী, শিক্ষা প্রশাসক, শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকদের চাকরিকালীন পেশাগত উন্নয়নে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে ২০ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসক এবং দেড় হাজার প্রধান শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

মাউশির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশের আগে প্রশিক্ষণের নতুন মডেল পরীক্ষামূলকভাবে চালু হবে। পরে এ মডেলের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে এর ব্যাপ্তি বাড়ানো হবে। তবে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এই প্রশিক্ষণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে নাকি বাধ্যতামূলক করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ বলেন, উদ্যোগটি অবশ্যই ইতিবাচক। এতে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে। তবে এ কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালনা করতে হবে। অর্থাৎ শিক্ষার প্রতিটি স্তরে প্রাক্‌-চাকরিকালীন প্রশিক্ষণ কার্যকর করা উচিত।