আকাশপথে জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কাছেই ৫ হাজার ৮৪২ কোটি টাকার বেশি পাওনা বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক)। বছরের পর বছর বিমান বাংলাদেশ অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জ পরিশোধ না করায় এই বকেয়া দাঁড়িয়েছে। পাঁচটি দেশীয় এয়ারলাইনসের কাছে বর্তমানে বেবিচকের মোট পাওনা ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর সিংহভাগই বিমান বাংলাদেশের কাছে।
বেবিচকের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জসহ বিপুল বকেয়ার কারণে আর্থিক চাপ বাড়ছে বেবিচকের ওপর। সরকার পরিবর্তন হয়, বিমানের প্রশাসন পরিবর্তন হয়। তবে বারবার চাপ দিয়েও বিমান থেকে বকেয়া আদায় করা যাচ্ছে না।
বেবিচকের অধীনে বর্তমানে তিনটি আন্তর্জাতিকসহ মোট আটটি বিমানবন্দর রয়েছে। তাদের আদায় করা অ্যারোনটিক্যাল চার্জগুলোর মধ্যে রয়েছে—উড়োজাহাজের ল্যান্ডিং চার্জ, রুট নেভিগেশন সার্ভিস চার্জ, বোর্ডিং ব্রিজ ব্যবহার চার্জ ও এমবারকেশন। নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জগুলো হলো—গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, চেক-ইন কাউন্টার ভাড়া, কার পার্কিং ও এভিয়েশন ক্যাটারিং সার্ভিস।
বেবিচকের অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের (২০২৬ সাল) আগস্ট পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কাছে বিভিন্ন অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জের বকেয়া এবং সারচার্জ মিলিয়ে বেবিচকের পাওনা ৫ হাজার ৮৪২ কোটি ৯১ লাখ ২৩ হাজার ৮৭৪ টাকা। তবে বকেয়া পরিশোধে তেমন উদ্যোগ নেই।
সূত্র জানায়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বকেয়ার মধ্যে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান- বন্দরের বিল ৩ হাজার ৪৫২ কোটি, চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ১ হাজার ৭৮১ কোটি, সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক
বিমানবন্দরের ৬০৩ কোটি, যশোর বিমানবন্দরের ১০ কোটি, সৈয়দপুর বিমানবন্দরের ৩৬ লাখ, রাজশাহী বিমানবন্দরের ১ কোটি ৯০ লাখ, কক্সবাজার বিমানবন্দরের ২ কোটি ২৬ লাখ এবং বরিশাল বিমানবন্দরের বিল ৩১ লাখ টাকা। এই বকেয়ার মধ্যে ৫১২ কোটি টাকা ভ্যাট এবং ৫৩ লাখ টাকা ইনকাম ট্যাক্সও রয়েছে। দীর্ঘদিন এই অর্থ পরিশোধ না করায় প্রভাব পড়ছে দেশের রাজস্বে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, বিমান বাংলাদেশের কাছে বেবিচকের আটকে থাকা অর্থ দিয়েই কক্সবাজার বিমানবন্দরের ৩ হাজার ৭১০ কোটি টাকার রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং ২ হাজার ১৬ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল। এ দুই প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ৫ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। আর বিমানের কাছে বেবিচকের পাওনা ৫ হাজার ৮৪২ কোটি টাকা। ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণেও এর চেয়ে ৩ ভাগের এক ভাগ টাকা খরচ হয়েছে। এমনকি শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের ২১ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ২৭ শতাংশও এই এক বকেয়া থেকে মেটানো যেত।
জানতে চাইলে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার (অব.) এ টি এম নজরুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বকেয়া পরিশোধে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের উদাসীনতা রয়েছে। বিমান বাংলাদেশ বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাবে লাভ দেখাচ্ছে। অথচ বছরের পর বছর দেনা থাকলেও তা এড়িয়ে যাচ্ছে। সিভিল এভিয়েশন বেসরকারি এয়ারলাইনসের দেনা পরিশোধে গলা চেপে ধরলেও বিমানকে বারবার ছাড় দিচ্ছে।’
জানা গেছে, বর্তমানে বেসরকারি উড়োজাহাজ সংস্থা জিএমজি এয়ারলাইনসের কাছে ৪১১ কোটি টাকার মতো পাওনা রয়েছে বেবিচকের। দীর্ঘদিন ধরে এয়ারলাইনসটির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এবং নিয়মিত পরিশোধ না করায় মূল বিলের তুলনায় সারচার্জ বা জরিমানার পরিমাণ বহুগুণ বেড়েছে। বেসরকারি ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের কাছে বেবিচকের পাওনা প্রায় ৩৯১ কোটি ও রিজেন্ট এয়ারওয়েজের কাছে ৪৫৪ কোটি টাকা। এই এয়ারলাইনস দুটির কার্যক্রম বন্ধ থাকা এবং নিয়মিত পরিশোধ না করায় মূল বিলের তুলনায় সারচার্জ বা জরিমানার পরিমাণ বহুগুণ বেড়েছে। বিমানবন্দরগুলোতে বিভিন্ন সেবার বিপরীতে বকেয়া পড়া এই অর্থ আদায়ের জন্য বেবিচকের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি ও প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
জানতে চাইলে বেবিচকের সদস্য (অর্থ) মোহাম্মদ নাজমুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বিমান বাংলাদেশের কাছে পাওনা প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। কয়েক মাস পরপর তারা কিছু বকেয়া পরিশোধ করে। তবে তা দেনার তুলনায় সামান্য। এই দেনা পরিশোধ করতে হলে বিমানকে বড় পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা কিছুদিন পরপরই বিমানকে তাগাদা দিয়ে চিঠি দিচ্ছি।’
সূত্র জানায়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা আয় এবং ৭৮৫ কোটি ২১ লাখ টাকা নিট মুনাফা দেখিয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সংস্থাটি লাভ দেখিয়েছিল ২৮২ কোটি টাকা। অথচ বেবিচকের কাছে বিপুল বকেয়া ছিল বিমানের। পাশাপাশি ২০২৫ সাল পর্যন্ত পদ্মা অয়েলের কাছে বিমানের বকেয়া ছিল ১ হাজার ২৭৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। নতুন করে জ্বালানি তেল কেনার টাকা পরিশোধ করলেও আগের বকেয়া পরিশোধ করেনি বিমান।
২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে পদ্মা অয়েলের টাকা বকেয়া রাখা শুরু করে বিমান বাংলাদেশ। ২০২০ সালে বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়ায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এই বছরগুলোতে বিমান প্রতি মাসে ৩০০ কোটি টাকার জেট ফুয়েল (উড়োজাহাজের জ্বালানি) কিনত। কিন্তু পরিশোধ করত ২০ কোটি টাকার মতো। ২০২০ সালে দেশে করোনা মহামারি শুরু হলে এভিয়েশন খাতের লোকসানের কথা উল্লেখ করে বকেয়া মওকুফের আবেদন করে বিপিসি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিল বিমান। তবে বিল মওকুফের আবেদন খারিজ করে বিপিসি।
২০০৮ সালে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার দেনায় ছিল বিমান। ওই সময় অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করে ১ হাজার ২১৬ কোটি টাকার সারচার্জ মওকুফ পায় সংস্থাটি। বাকি ৫৭৩ কোটি টাকা পরিশোধ করে দায়মুক্তি পায়। ২০১৭ সালেও বিমানের বকেয়া ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা মওকুফ করা হয়। তবে বর্তমানের বকেয়া মাফ পাচ্ছে না। বর্তমানে ছোট ছোট কিস্তিতে টাকা পরিশোধের চেষ্টা করছে বিমান বাংলাদেশ। তবে বিপিসি জানায়, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে বকেয়া পরিশোধে ১৫-১৬ বছর লেগে যাবে বলে জানিয়েছে পদ্মা অয়েল।
সার্বিক বিষয়ে জানতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ বিভাগ) মহিউদ্দিন আহমেদকে একাধিকবার কল দিয়েও পাওয়া যায়নি। মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে একই বিভাগের ব্যবস্থাপক আনন্দ সান্যাল আজকের পত্রিকাকে জানান, গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার জন্য তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নন।