তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান তিন দিনের বেইজিং সফরে স্বাগতিক দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর সঙ্গে বৈঠককালে এই আহ্বান জানান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত মঙ্গলবার তাঁর প্রথম চীন সফরে গিয়ে বুধবার (৬ মে) এই বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে ১০ দফা ঘোষণা-সংবলিত একটি যৌথ বিবৃতি দেয় দুই দেশ।
এতে প্রথম দফায় বলা হয়, চীনা প্রজাতন্ত্রের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহামান্য ওয়াং ইর আমন্ত্রণে বাংলাদেশ গণপ্রজাতন্ত্রী সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহামান্য ড. খলিলুর রহমান ৫ থেকে ৭ মে পর্যন্ত তাঁর প্রথম চীন সফর সম্পন্ন করেছেন। বাকি দফাগুলো হলো—
২. উভয় পক্ষ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে গভীর আলোচনা করেছে। তারা ব্যাপক ঐকমত্যে পৌঁছেছে এবং একে অপরের মূল স্বার্থ রক্ষায় ও প্রধান উদ্বেগগুলো নিরসনে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
৩. দুই দেশ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচ নীতি বজায় রাখতে, উচ্চপর্যায়ের সফরের গতিশীলতা ধরে রাখতে এবং রাজনৈতিক পারস্পরিক বিশ্বাস ও উন্নয়ন কৌশলের সমন্বয় গভীরতর করতে একমত হয়েছে। চীন-বাংলাদেশ ‘সব কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্ব’ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়েও তারা প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে।
৪. উভয় পক্ষ জোর দিয়ে বলেছে যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাবের কর্তৃত্ব প্রশ্নাতীত। বাংলাদেশ পুনরায় ‘এক চীন’ নীতির প্রতি পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের সরকারই পুরো চীনের একমাত্র বৈধ সরকার। বাংলাদেশ চীনের জাতীয় পুনঃএকত্রীকরণ প্রক্রিয়াকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। এর বিপরীতে চীন বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রচেষ্টায় সমর্থন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
৫. চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সফল সূচনায় বাংলাদেশ অভিনন্দন জানিয়েছে। বাংলাদেশের নতুন সরকারের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে চীন তার সমর্থন ব্যক্ত করেছে। উভয় পক্ষ উচ্চমানের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ সহযোগিতা এগিয়ে নিতে এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, পানিসম্পদ, স্বাস্থ্য, জনযোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদার করতে সম্মত হয়েছে। দীর্ঘদিনের উন্নয়নের সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ চীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি, ‘তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি)’ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চীনের অংশগ্রহণ ও সমর্থন চাওয়া হয়েছে।
৬. প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের প্রস্তাবিত ‘মানবজাতির শেয়ারড বা সমন্বিত ভবিষ্যৎ সমাজ’ গঠনের উদ্যোগের উচ্চ প্রশংসা করেছে বাংলাদেশ। চীনের সুদূরপ্রসারী বৈশ্বিক উদ্যোগগুলোকে বাংলাদেশ মূল্যায়ন ও স্বাগত জানিয়েছে।
৭. দুই পক্ষই জাতিসংঘের সনদের উদ্দেশ্য ও নীতি, বহুপাক্ষিকতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গণতন্ত্র এবং বিরোধ ও সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রতি নিজেদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। এক সমান ও সুশৃঙ্খল বহুমুখী বিশ্ব এবং সর্বজনীনভাবে উপকারী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন গড়ে তুলতে দুই দেশ যৌথভাবে কাজ করতে সম্মত হয়েছে।
৮. মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের দেওয়া চারটি প্রস্তাবের উচ্চ প্রশংসা করেছে বাংলাদেশ। উভয় পক্ষ অবিলম্বে ও সর্বাত্মক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। শান্তি পুনরুদ্ধার, বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক চলাচল বজায় রাখার লক্ষ্যে সব কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে তারা সমর্থন জানিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি মোকাবিলায় যোগাযোগ বজায় রাখতে এবং গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে দুই পক্ষই প্রস্তুত রয়েছে।
৯. বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সমস্যার একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করতে চীন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে সহায়তা চালিয়ে যাবে। এ ছাড়া প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সমর্থন দিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে চীন।
১০. পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান তাঁর ও তাঁর প্রতিনিধিদলের প্রতি উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং চীন সরকারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।