বরখাস্ত হওয়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের উপস্থিতিতে তাঁর নির্দেশে ২৪ জনকে খুনের বর্ণনা দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী। আজ বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ তাঁর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়।
আওয়ামী লীগের দেড় দশকে শতাধিক মানুষকে গুম-খুন ও নির্যাতনের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে জবানবন্দি দেন ওসমানী। তিনি বর্তমানে খুলনাতে বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ডেপুটি এক্সাম কন্ট্রোলার হিসেবে কর্মরত।
সাব্বির রহমান ওসমানী তাঁর জবানবন্দিতে বলেন, তিনি ২০০৯ সালের অক্টোবর র্যাব-৮ এ বরিশালে উপ-অধিনায়ক হিসেবে যোগদান করেন। তখন র্যাবের ডাইরেক্টর ইন্টেলিজেন্স ছিলেন লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান। জিয়াউল আহসান বিভিন্ন সময় বরিশালের অধিনায়ককে টেলিফোনে বিভিন্ন নির্দেশনা দিতেন এবং ওসমানীকেও সরাসরি টেলিফোন করতেন।
২০১০ সালের জানুয়ারিতে একদিন রাতের বেলা জিয়াউল আহসান বরিশালে উপস্থিত হন। কিছুক্ষণ পর অধিনায়ক জানান, জিয়াউল আহসান তাঁকে ডাকছেন। কিছুক্ষণ পর জিয়া তাদের নিয়ে বের হন। সঙ্গে ঢাকা থেকে র্যাবের (ইন্ট উইং) থেকে আসা মাইক্রোবাসটিও ছিল। প্রায় আড়াই ঘণ্টা গাড়ি চলার পর পাথরঘাটার চরদুয়ানী ঘাটে গিয়ে পৌঁছায়। সেখানে পূর্বে থেকেই র্যাব–৮ এর গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা একটি ট্রলার প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। প্রথমে ঢাকা থেকে যাওয়া সদস্যরা ট্রলারে ওঠেন। ওই সময় হাত বাঁধা এবং মাথায় কালো টুপি পরা অবস্থায় একজন ব্যক্তিকেও ট্রলারে তোলা হয়। হাত বাঁধা লোকটিকে ট্রলারের মাছ সংরক্ষণের খোলের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখা হয়।
সাক্ষী অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সাব্বির বলেন, সবাই ট্রলারে উঠলে জিয়াউল আহসান সুকানীকে চরদুয়ানী খাল থেকে বের হয়ে মোহনার দিকে যেতে বলেন। প্রায় তিন ঘণ্টা পর র্যাব সদস্যরা হাত বাঁধা ব্যক্তির গলা এবং পা বরাবরে দুটি সিমেন্টের বস্তা বেঁধে ফেলেন। পরে ওই ব্যক্তির মাথা এবং কান বরাবর ছোট বালিশ ঠেকিয়ে পিস্তল দিয়ে এক রাউন্ড গুলি করে...।
ওসমানী বলেন, ২০১০ সালে একদিন রাতে জিয়াউল আহসান তার সরকারি গাড়ি ও দুইটি মাইক্রোবাস নিয়ে বরিশালে উপস্থিত হন। কিছুক্ষণ পর তাদের নিয়ে বের হয়ে চরদুয়ানী ঘাটে পৌঁছায়। সেখানে ফিশিং ট্রলার পূর্বে থেকেই প্রস্তুত ছিল। ওই দিন ঢাকা থেকে নিয়ে যাওয়া চারজন ব্যক্তিকে মাথায় কালো টুপি পরা এবং হাত পেছনে বাঁধা অবস্থায় ট্রলারে ওঠানো হয়। এমনভাবে ঢেকে নেওয়া হয়েছিল যে তারা পুরুষ না মহিলা সেটা বোঝা যাচ্ছিল না। ট্রলারটি চরদুয়ানী খালের মুখে এসে পৌঁছালে জিয়াউল আহসান মোহনার দিকে গিয়ে পানির গভীরতা মাপতে বলেন। পরে জিয়াউল আহসান ইশারা করলে চারজনকে এক এক করে গলা এবং পা বরাবর দুটি করে সিমেন্ট ভর্তি বস্তা বেঁধে ফেলেন র্যাব সদস্যরা। পরে মাথায় পিস্তল দিয়ে এক রাউন্ড করে গুলি করে। গুলির পর একজন নাভি বরাবর পেট কেটে ফেলে। অন্য একজন পেটের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে কাটার সঠিকতা নিশ্চিত করে। পরে জিয়াউল আহসান ইশারা দিলে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।
ঘটনার তিন দিনের মধ্যে শরণখোলা রেঞ্জের বলেশ্বর নদীতে মুখ ঢাকা, পেট কাটা এবং শরীরের সিমেন্টের বস্তা বাঁধা অবস্থায় একটি মৃতদেহ ভেসে ওঠার খবর পাওয়া যায়। ২-৩ মাস পর জানা যায় ওই ব্যক্তি সাবেক বিজিবি সদস্য নজরুল।
নৌকার মাঝিকে খুনের বিষয়ে ওসমানী বলেন, ২০১১ সালের জুনে হঠাৎ করেই একদিন ফোন করে জিয়াউল আহসান তাঁর কাছে গলফ কাজে নিয়োগপ্রাপ্ত মাঝিদের মধ্যে অন্যতম আলকাছ মাঝির ব্যাপারে জানতে চান। তিনি বলতে থাকেন, ‘আলকাছ মাঝি গলফ অপারেশন সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য চরদুয়ানী বাজারে বলে বেড়াচ্ছে। যা র্যাবের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি হয়ে দেখা দিয়েছে।’
কয়েক দিন পর আলকাছের স্ত্রী জানান, ৪-৫ দিন আগে আলকাছকে ফোন দিয়ে জিয়াউল আহসান ডেকে নেন। এরপর থেকে আলকাছের সঙ্গে আর যোগাযোগ হচ্ছে না।
সুন্দরবনে অপারেশনের বর্ণনা দিতে গিয়ে সাব্বির রহমান বলেন, র্যাবে দায়িত্ব পালনের সময় তৎকালীন গোয়েন্দা শাখার প্রধান জিয়াউল আহসানের পরিকল্পনা এবং নির্দেশনায় তিনটি সুন্দরবন কেন্দ্রিক তথাকথিত এনকাউন্টার অভিযান পরিচালনা প্রত্যক্ষ করেন। সুন্দরবনের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব র্যাব-৬ এর ওপরে বর্তালেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে জিয়াউল আহসান অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে র্যাব-৮ কে ব্যবহার করতেন। একদিন নিশানখালীতে অভিযান পরিচালনার সময় এলাকাটি ঘিরে ফেলার প্রস্তুতিকালে হঠাৎই বনের ভেতর থেকে হুইসিলের শব্দ পাওয়া যায়। হুইসেলটি ছিল অগ্রগামী গোয়েন্দা সদস্যদের একটি সিগন্যাল। সিগন্যাল শোনামাত্রই জিয়াউল আহসান অভিযানে থাকা দলকে ঘিরে থাকা বন লক্ষ্য করে গুলি করার নির্দেশ দেন। বেশ কিছুটা সময় ধরে বন লক্ষ্য করে গুলি শেষে তল্লাশি চালিয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদ এবং দুটি মৃতদেহ উদ্ধার দেখানো হয়। পরবর্তীতে মামলার প্রক্রিয়াকালে ছয়টি মৃতদেহ দেখানো হয়।
পরবর্তীতে জানা যায়, চারজনকে অগ্রগামী দল পূর্বেই ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে জিয়াউল আহসানের নির্দেশে গুলি করে হত্যা করে।
ওসমানী বলেন, ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে কটকা ফরেস্ট স্টেশন থেকে দুই কিলোমিটার দক্ষিণে জিয়াউল আহসানের পরিকল্পনা এবং নির্দেশনায় র্যাব-৮ ও র্যাব-৬ যৌথ অভিযান পরিচালনা করেন। মূল অভিযান পরিচালনার আগের দিন রাতে জিয়াউল আহসান পাথরঘাটার চরদুয়ানীতে ট্রলারে করে আগের মতো মাথায় টুপি পড়ানো ও হাত বাঁধা অবস্থায় পাঁচজনকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চারজনকে আগের মতই সিমেন্টের বস্তা বেঁধে গুলি করে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। বাঁচিয়ে রাখা এক ব্যক্তিকে পর দিন ট্রলার থেকে নামিয়ে বনের ভেতরে নিয়ে জিয়াউল আহসানের নির্দেশে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে স্থানীয় পুলিশের উপস্থিতিতে বন তল্লাশি করে কিছুসংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের পাশাপাশি চারটি মৃতদেহ উদ্ধার দেখানো হয়।
পরবর্তীতে মার্চে জিয়াউল আহসানের পরিকল্পনা এবং নির্দেশনায় সুন্দরবনের ভোলা নদী সংলগ্ন মরা ভোলা এলাকায় একটি ত্রিমাত্রিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। ওই সময় প্রায় আধঘণ্টা গুলির পর তল্লাশি করে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অস্ত্র, গোলাবারুদ ও পাঁচটি মৃতদেহ উদ্ধার দেখানো হয়। তিনটি এনকাউন্টার অভিযান আলাদাভাবে উল্লেখ করার কারণ হিসেবে মনে হয়েছে সবগুলোই ছিল সাজানো।
সাব্বির রহমান ওসমানী আরও বলেন, র্যাবের দায়িত্ব পালনের সময় তিনি জানতে পারেন জিয়াউল আহসান ১৫ / ২০ বার বরিশাল অঞ্চল ব্যবহার করে গলফ অপারেশন পরিচালনা করেছেন।
মানসিক যন্ত্রণায় চাকরির ১৮ বছর পূর্ণ হলে তিনি স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের আবেদন করেন বলে জানান সাবেক এ সেনা কর্মকর্তা।