সাইবার সুরক্ষা বিল পাস
সাইবার স্পেসে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংসদ সদস্যরা। একই সঙ্গে নতুন সাইবার আইন যেন বিরোধী মত দমন বা রাজনৈতিক হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধী দলের সদস্যরা।
আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) বিল, ২০২৬-এর ওপর আলোচনায় এসব দাবি উঠে আসে। পরে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বিলটি পাসের জন্য উত্থাপন করলে জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব নিষ্পত্তির পর কণ্ঠভোটে পাস হয়।
পাস হওয়া সংশোধনীতে সাইবার সুরক্ষা আইনের ২০ ধারা বাতিল করা হয়েছে। ওই ধারায় সাইবার স্পেসে জুয়াসংক্রান্ত অপরাধ ও শাস্তির বিধান ছিল। একই দিনে সংসদে জুয়া ও অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে পৃথক আইন পাস হওয়ায় সেখানে অনলাইন জুয়ার সংজ্ঞা ও শাস্তির বিধান বিস্তারিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, সে কারণে সাইবার সুরক্ষা আইন থেকে ওই ধারা বাদ দেওয়া হয়েছে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমরা যারা রাজনীতি করি, পাবলিক ফিগার, নোন ফেস, প্রতিনিয়ত সাইবার নিপীড়নের শিকার হচ্ছি।’ তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে সত্য-মিথ্যা তথ্য আলাদা করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ছে। গ্রামের মানুষের হাতেও এখন স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পৌঁছে গেছে। ফলে, বিশেষ করে, রাজনীতি ও গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত নারীদের জন্য সাইবার স্পেস দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, নারীদের জন্য একটি নিরাপদ সাইবার পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
রুমিন ফারহানা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যে দলেরই কর্মী বা সমর্থক হোন না কেন, নারীদের অনলাইনে হয়রানি বন্ধ করতে হবে। বিরোধী মতের কর্মীদের নিপীড়ন সাময়িকভাবে কারও কাছে আনন্দদায়ক মনে হলেও শেষ পর্যন্ত তা বুমেরাং হতে পারে।
জনমত যাচাইয়ের আলোচনায় চট্টগ্রাম-১৫ আসনের জামায়াতের সদস্য শাহাজাহান চৌধুরী বলেন, অতীতে সাইবার আইন ব্যবহার করে শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক নেতা ও সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হয়েছে। নতুন আইন যেন একইভাবে ব্যবহৃত না হয়, সে বিষয়ে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।
শাহাজাহান চৌধুরী অভিযোগ করেন, আগের সরকার সাইবার অপরাধের নামে শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা এবং গ্রেপ্তার করেছে।
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য জি এম নজরুল ইসলাম বলেন, যোগাযোগ, ব্যবসা, বিনোদনসহ জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্র এখন সাইবার স্পেসনির্ভর। তবে এর সঙ্গে হ্যাকিং, ব্ল্যাকমেল, ভুয়া তথ্য ছড়ানো, আর্থিক জালিয়াতি ও অনলাইন হয়রানিও বেড়েছে। এসব অপরাধ দমনে আইন প্রয়োজন হলেও তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে যেন বাক্স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
চট্টগ্রাম-১৬ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, এআইয়ের অপব্যবহার, ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর মতো অপরাধ প্রতিরোধে আইন প্রয়োজন। তবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা পক্ষ যেন এ ধরনের আইন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে না পারে, সে নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে আরও কঠোর আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়ে বলেন, অনলাইনে অপপ্রচার ও চরিত্রহননের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
আলোচনার জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চরিত্রহনন, গুজব, অপতথ্য, মানহানিকর কনটেন্ট এবং সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের বিষয়গুলো নিয়ে সরকার আলাদাভাবে কাজ করছে। তিনি জানান, এ বিষয়ে মন্ত্রিসভায় আলোচনা হয়েছে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে যাচাই-বাছাই চলছে। প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে এ বিষয়ে পৃথক সংশোধনী বা নতুন বিল আনা হবে।
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, আইনটি সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে, নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে। তবে অতীত অভিজ্ঞতার কারণে মানুষের মধ্যে শঙ্কা রয়েছে। তাই আইনের সঠিক ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মন্তব্য করেন।