নতুন বাসিন্দা হিসেবে বঙ্গভবনে ওঠা মির্জা ফখরুল ইসলামের জন্য এখন শুধুই আনুষ্ঠানিকতার বিষয়। রাষ্ট্রপতি পদে তাঁকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। তফসিল অনুযায়ী ২০ আগস্ট হবে ভোট। জাতীয় সংসদের বর্তমান হিসাব অনুযায়ী সহজেই বলা যায়, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়ে তিনিই হতে চলেছেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি।
দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গতকাল বৃহস্পতিবার বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের বৈঠক হয় সচিবালয়ে। সেই বৈঠকে মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে দলের মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক শেষে তাঁর হাতে মনোনয়ন ফরম তুলে দেন দলের চেয়ারম্যান। এরপর দুপুরেই রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্র নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছে বিএনপি।
মনোনয়ন পাওয়ার আগে বিএনপির মহাসচিব পদ থেকে পদত্যাগ করেন মির্জা ফখরুল। বর্তমান সরকারে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা।
আওয়ামী লীগের আমলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পাওয়া মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করে বঙ্গভবন ছাড়েন গত ২৪ জুলাই। এরপর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল গতকাল। এদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় ছিল। সময় শেষ হওয়ার পর ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, মোট ৩টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। একটি বিএনপি প্রার্থী মির্জা ফখরুলের এবং অন্য দুটি ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদের। ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে।
অলি আহমদের দুটি মনোনয়নপত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে সচিব বলেন, ‘এটা তো আমাদের বিষয় না। আমরা বাছাই করব। প্রথমটা যদি বাতিল হয়, তখন দ্বিতীয়টা বাছাই করব।’
তফসিল অনুযায়ী, ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট হবে। এবার ১৯৯১ সালের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট হচ্ছে। মনোনয়ন যাচাই-বাছাই হবে ১৬ আগস্ট, প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট বিকেল ৪টা পর্যন্ত। ২০ আগস্ট বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের সংসদকক্ষে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এই ভোট গ্রহণের জন্য সেদিন সংসদের বৈঠকও ডাকা হয়েছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন আইনজীবী। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে ও পরে ঠাকুরগাঁও থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং স্বাধীন বাংলাদেশে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মির্জা ফখরুলের মায়ের নাম মির্জা ফাতেমা আমিন।
মির্জা ফখরুল ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্যও রাজনৈতিকভাবে বেশ সমৃদ্ধ। তাঁর চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা, সাবেক মন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের চতুর্থ স্পিকার। তিনি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে ভূমিমন্ত্রী, দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে স্পিকার এবং পরে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মির্জা ফখরুলের আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা ১৯৭১ সালের এপ্রিলে গঠিত মুজিবনগর সরকারের ডাইরেক্টরেট অব ইয়ুথ ক্যাম্পের পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম ১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন এবং ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বেশ কয়েকটি সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি পরিদর্শন ও আয়-ব্যয় পরীক্ষণ অধিদপ্তরে নিরীক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। এরপর ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। ১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর এস এ বারী পদত্যাগ করা পর্যন্ত এ দায়িত্বে ছিলেন তিনি। পদত্যাগের পর তিনি পুনরায় শিক্ষকতায় ফিরে যান এবং ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়ে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে মির্জা ফখরুল সক্রিয় ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (বর্তমান বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন) সদস্য ছিলেন এবং এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের সময় তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মির্জা ফখরুল ১৯৮৬ সালে পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে শিক্ষকতা পেশা থেকে অব্যাহতি নেন। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে এরশাদের সামরিক সরকারবিরোধী আন্দোলন চলাকালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তিনি বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯১ সালের পঞ্চম ও ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী খাদেমুল ইসলামের কাছে পরাজিত হন। এরপর ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে আওয়ামী লীগের রমেশ চন্দ্র সেনের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯১০ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একই বছর নভেম্বরে গঠিত খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় তিনি প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মির্জা ফখরুল পুনরায় রমেশ চন্দ্র সেনের কাছে পরাজিত হন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি একই সঙ্গে ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে মনোনয়ন পান এবং বগুড়া-৬ আসনে নির্বাচিত হন। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি শপথ গ্রহণ না করায় নির্বাচন কমিশন আসনটি শূন্য ঘোষণা করে এবং সেখানে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব পদে নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। একই সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি বিরোধীদলীয় মুখপাত্র হিসেবে গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে পরিচিতি পান। ২০১১ সালের ২০ মার্চ তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি। ৫ বছর পর ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ দলের ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে মির্জা ফখরুল মহাসচিব হিসেবে নির্বাচিত হন।
২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের হাতে মনোনয়ন ফরম তুলে দেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল সচিবালয়ে। ছবি: বিএনপি মিডিয়া সেল