সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে একটি মামলায় আইনজীবীকে জরিমানার (কস্ট) আদেশ নিয়ে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকনের মধ্যে কথোপকথনের একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের সব বিচারপতি এজলাস ছেড়ে চলে গেছেন। আজ মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে ওই ঘটনার পর বিচারপতিরা আর এজলাসে আসেননি।
পরে ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন সাংবাদিকদের বলেন, ‘সকালে আপিল বিভাগের এক নম্বর আইটেমে একটি মামলায় মহিলা আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। ১৩ নম্বর আইটেম শেষ হওয়ার পর আমি প্রধান বিচারপতিকে বলি, “আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর আপিল বিভাগে মামলা খুব একটা হচ্ছে না। আইনজীবীদের ইনকাম (আয়) কমে গেছে।” আমি বোঝাতে চেয়েছি, আগে আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারপতি ছিলেন। তিনটি বেঞ্চ ছিল। এখন একটি বেঞ্চ। একটি মামলা স্থগিত হলে সেখানে শুনানি করতে পারছি না। চেম্বার আদালত স্থগিত করলে এটা শুনানি করতে এক বছর লাগে।’
মাহবুব উদ্দিন খোকন আরও বলেন, ‘যেহেতু একটি বেঞ্চ, মানুষ দীর্ঘদিন ন্যায়বিচার পাচ্ছে না। মামলা হলে আইনজীবীদের ইনকাম হবে। কম হোক, বেশি হোক। আমি খুব বিনয়ের সঙ্গে বললাম—একজন জুনিয়র আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা কস্ট দেওয়া অনেক বেশি হয়ে গেছে, তাঁকে মাফ করে দেন। আমি চিন্তা করিনি যে উনি (প্রধান বিচারপতি) এত রিঅ্যাক্ট করবেন’।
মাহবুব উদ্দিন খোকনের বক্তব্যের একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ এজলাস ছেড়ে চলে যান।
এদিকে নিজ কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘উনি (সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকন) আইনজীবীদের কল্যাণে ও স্বার্থে কিছু কথা প্রধান বিচারপতির কাছে বলেছেন। মামলার বাদী পাঁচটি রিট দায়ের করেছেন একই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে। অথচ পূর্বে রিজেক্ট হওয়ার আদেশটি পরবর্তী রিটে উল্লেখ করা হয়নি। যে কারণে নারী আইনজীবীকে আপিল বিভাগ ফাইন করেছেন পাঁচ লাখ টাকা এবং রিট আবেদনকারীকে পাঁচ লাখ টাকা।’
অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, আদালতের বক্তব্য অনুযায়ী সিরিয়াস ফ্রড করা হয়েছে। আদালতের সঙ্গে প্রতারণা এমনকি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ইতিপূর্বের আদেশও ফ্রড করা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি বিচারিক শৃঙ্খলা ও সততাকে প্রাধান্য দেন। কোনো প্রতারণা যদি দেখেন, তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন।
যাত্রাবাড়ী থানার ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রার মিজানুর রহমান মুরাদের নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মো. নুর আলম একাধিক রিট করেছিলেন। নুর আলমের পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মাহবুব উদ্দিন খোকন। নিকাহ রেজিস্ট্রার মিজানুর রহমান মুরাদের পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী অনিক আর হক, সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির ও আইনজীবী অমিত দাশগুপ্ত।
এই মামলায় তথ্য গোপন করে একাধিক রিট করায় আজ প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ আইনজীবী ও রিটকারীকে পাঁচ লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেন। এই টাকা ৩০ দিনের মধ্যে শিশু হাসপাতালে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যাঁদের জরিমানা করা হয়েছে, তাঁরা হলেন রিটকারী মো. নুর আলম ও আইনজীবী সুফিয়া আহমেদ।
আইনজীবী অমিত দাশগুপ্ত বলেন, ২০১৮ সালে মো. মিজানুর রহমান মুরাদকে কাজি নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই নিয়োগ চ্যালেঞ্জ করে বিভিন্ন সময় তথ্য গোপন করে ছয়টি রিট করেন নুর আলম। এসব মামলার কোনোটিতেই আগের মামলার আদেশ ও আপিল বিভাগের আদেশের বিষয়ে বলা হয়নি। আজ রিট শুনানির সময় আপিল বিভাগের রেকর্ড ও পুরোনো ফাইল তলব করে দেখা হয়, একই বাদী ও একই আইনজীবী পরপর একাধিক রিট আবেদন করেছেন এবং আগের মামলাগুলোর তথ্য গোপন করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ রিটকারী ও তাঁর আইনজীবীকে জরিমানা করেছেন।