দেশে আইনের শাসন, মানবিক মূল্যবোধ ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। একই সঙ্গে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
আজ বুধবার রাজধানীর বনানীর শেরাটন হোটেলে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আয়োজিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের জাতীয় পর্যায়ের প্রতিভা অন্বেষণ প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন। হযরত মুহাম্মদ (সা.) ইনস্টিটিউট এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
আইনমন্ত্রী বলেন, ইনস্টিটিউটটি দীর্ঘদিন ধরে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের প্রতিভা বিকাশ এবং তাঁদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সমাজের যে মানুষগুলো নানা সীমাবদ্ধতার কারণে পিছিয়ে পড়েছেন, তাঁদের মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া অত্যন্ত মহৎ কাজ।
আইনমন্ত্রী বলেন, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পাশাপাশি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদেরও এ ধরনের কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়েছে, এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তাঁরাও মানুষ এবং তাঁদেরও সমান অধিকার রয়েছে। তাঁদের অধিকার ও কল্যাণে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
আইনমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে সরকারি সহযোগিতা নেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি নিজেও সমাজকল্যাণ মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন, যাতে প্রতিষ্ঠানটির এ ধরনের মানবিক ও কল্যাণমূলক কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত করা যায়।
সমাজের বাস্তবতা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, আমাদের চারপাশে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন যাঁদের চোখে আলো আছে, কিন্তু তাঁরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কিংবা মানবিক মূল্যবোধ রক্ষায় ভূমিকা পালন করছেন না। আবার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও অনেকে অন্তর্দৃষ্টি ও মানবিক চেতনা দিয়ে সমাজকে আলোকিত করার চেষ্টা করছেন। তাই শুধু চোখে আলো থাকলেই হবে না, মানুষের অন্তর্চক্ষুও খুলতে হবে।
আইনমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন। অনেকে হাত-পা হারিয়েছেন, অনেকে গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। তাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। যাঁরা এসব অন্যায় ও মানবিক বিপর্যয় দেখতে পাচ্ছেন না, তাঁদের প্রতি আহ্বান—চোখ খুলুন, সত্যকে দেখুন এবং মানবিক বিবেক দিয়ে দায়িত্ব পালন করুন।
আইনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে নাগরিকের দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে। তাই আমরা যে যেখানে থাকি না কেন, নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ববোধ ও বিবেকের তাড়নায় কাজ করতে হবে। ভুল হলে তা স্বীকার করে সংশোধন করতে হবে এবং দেশকে এগিয়ে নিতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
আইনমন্ত্রী বলেন, জননী ও জন্মভূমির চেয়ে আপন কিছু নেই। দেশের জন্য, মানুষের জন্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষ স্বাধীনতার স্বাদ, গণতন্ত্রের স্বাদ এবং আইনের শাসনের স্বাদ পাবে।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশে যাতে কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদ পুনর্বাসিত হতে না পারে এবং আমরা নিজেরাও যেন কোনো ধরনের স্বৈরাচারী মানসিকতায় পরিণত না হই, সেজন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। শুধু বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা নয়, বরং ন্যায়, মানবিকতা ও আইনের শাসনের পক্ষে দাঁড়াতে হবে।
আইনমন্ত্রী মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শান্তি, সহনশীলতা, সাম্য ও মানবিকতার শিক্ষাকে ধারণ করে সমাজ ও রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) এম নূরুদ্দীন খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ফয়েজ আহমেদ, ঢাকাস্থ ইরান দূতাবাসের প্রথম কাউন্সিলর এসরাফিল আমিরি জোরগাজদিনি প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, হামদ ও নাতে রাসুল (সা.), কম্পিউটার, তথ্যপ্রযুক্তি ও রচনা প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষার্থীরা এতে অংশগ্রহণ করেন।
উল্লেখ্য, হযরত মুহাম্মদ (সা.) ইনস্টিটিউট ২০০৪ সাল থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও সুবিধাবঞ্চিত ব্যক্তিদের জন্য ইংরেজি ও আরবি ভাষা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ব্রেইল পদ্ধতিতে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ প্রদান করে আসছে। পাশাপাশি পবিত্র রবিউল আউয়াল মাস উপলক্ষে প্রতিবছর প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন প্রতিভা অন্বেষণ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে।