দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দলের সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বড় ধরনের কোনো ব্যত্যয় বা দৈব দুর্বিপাক না ঘটলে বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে তিনিই হতে যাচ্ছেন দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় সংসদ সদস্যদের দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার অধিকার নেই। এবং জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা শতভাগ। ফলে, এটা অনুমান করা যায় যে—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই বাংলাদেশের ১৯ তম ব্যক্তি হিসেবে রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন। তবে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ বিচারে তিনি দেশের ২৩ তম রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন আইনজীবী। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে ও পরে ঠাকুরগাঁও থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং স্বাধীন বাংলাদেশে বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। তাঁর মা মির্জা ফাতেমা আমিন।
মির্জা ফখরুল ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্যও রাজনৈতিকভাবে বেশ সমৃদ্ধ। তাঁর চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা, সাবেক মন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের চতুর্থ স্পিকার। তিনি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে ভূমিমন্ত্রী, দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে স্পিকার এবং পরে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা ১৯৭১ সালের এপ্রিলে গঠিত মুজিবনগর সরকারের ডাইরেক্টোরেট অব ইয়ুথ ক্যাম্পের পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম ১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন এবং ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি বেশ কয়েকটি সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ সরকারের’ পরিদর্শন ও আয়-ব্যয় পরীক্ষণ অধিদপ্তরে’ নিরীক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন।
এরপর, ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তিনি তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এসএ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান এবং ১৯৮২ সালে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর এসএ বারী পদত্যাগ করা পর্যন্ত এ দায়িত্বে ছিলেন। পদত্যাগের পর তিনি পুনরায় শিক্ষকতায় ফিরে যান এবং ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়ে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে মির্জা ফখরুল সক্রিয় ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (বর্তমান বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন) সদস্য ছিলেন এবং এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মির্জা ফখরুল ১৯৮৬ সালে পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে শিক্ষকতা পেশা থেকে অব্যাহতি নেন। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে এরশাদের সামরিক সরকারবিরোধী আন্দোলন চলাকালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তিনি বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন এবং একই সাথে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষকদলের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯১ সালের পঞ্চম ও ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী খাদেমুল ইসলামের কাছে পরাজিত হন। এরপর, ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে আওয়ামী লীগের রমেশ চন্দ্র সেনের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯১০ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একই বছর নভেম্বরে গঠিত খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় তিনি প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি পুনরায় রমেশ চন্দ্র সেনের কাছে পরাজিত হন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি একই সাথে ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে মনোনয়ন পান এবং বগুড়া-৬ আসনে নির্বাচিত হন। তবে পরবর্তীতে তিনি শপথ গ্রহণ না করায় নির্বাচন কমিশন আসনটি শূন্য ঘোষণা করে এবং সেখানে উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
রাজনৈতিক জীবনে ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে তিনি দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব পদে নির্বাচিত হন। একই সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি বিরোধী দলীয় মুখপাত্র হিসেবে গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে পরিচিতি পান। ২০১১ সালের ২০ মার্চ তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ঘোষণা করেন। এই মনোনয়ন নিয়ে দলে কিছু বিভ্রান্তি ও আলোচনা তৈরি হলেও ২১ মার্চ ২০১১ তারিখে বেগম খালেদা জিয়া সৌদি আরব সফরে যাওয়ার আগে পুনরায় তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে ঘোষণা করলে বিভ্রান্তির অবসান ঘটে।
পরে ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ দলের ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন। বিরোধী দলের দায়িত্ব পালনকালে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি সহ বিভিন্ন ইস্যুতে তৎকালীন সরকারের সমালোচনায় সোচ্চার ছিলেন এবং দেশব্যাপী বিএনপির একাধিক আন্দোলন কর্মসূচীর নেতৃত্ব দেন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাহাত আরা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। রাহাত আরা বেগম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। এই দম্পতির দুই মেয়ে রয়েছে। তাঁরা হলেন—মির্জা শামারুহ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে সেখানেই শিক্ষকতা করেছেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত। ছোট কন্যা মির্জা সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং বর্তমানে ঢাকার একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতির উত্তাল ময়দানে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক দীর্ঘ লড়াইয়ের নাম। বিগত প্রায় দেড়-দুই দশকে দেশের প্রধান বিরোধী দলের অন্যতম শীর্ষ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তিনি ক্রমাগত রাজনৈতিক নিপীড়ন, মামলা আর গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক বড় অংশই কেটেছে আন্দোলনের রাজপথে কিংবা কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে।
গাড়ি ভাঙচুর, পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া, নাশকতামূলক কার্যকলাপ কিংবা বোমাবাজির মতো একশোরও বেশি মামলা মাথায় নিয়ে তাঁকে প্রতিনিয়ত আদালতের বারান্দায় দৌড়াতে হয়েছে। বিরোধী দলকে কোনঠাসা করার রাজনৈতিক কৌশলেই এই বিপুলসংখ্যক মামলা চাপানো হয়েছিল বলে তাঁর দল ও আইনজীবীরা বরাবরই বলে এসেছেন।
রাজপথের লড়াই-সংগ্রাম পরিচালনা করতে গিয়ে মির্জা ফখরুলকে অন্তত ১১ বার কারাগারে যেতে হয়েছে এবং জীবনের প্রায় সাড়ে তিন বছর সময় কাটাতে হয়েছে কারান্তরালে। ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় একাধিকবার কয়েক মাস করে তাঁকে বন্দি থাকতে হয়। এমনকি ২০১৬ সালের ২৯ মার্চ বিএনপির পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার পরদিনই একটি পুরোনো মামলায় তাঁকে জেলে যেতে হয়েছিল।
পরে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে দলের বিভাগীয় সমাবেশের ঠিক আগে গভীর রাতে উত্তরার বাসভবন থেকে তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া কিংবা ২০২৩ সালের অক্টোবরের সমাবেশের পরদিন ভোরে গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস কারাগারে থাকার ঘটনাগুলো তাঁর ওপর নেমে আসা ধারাবাহিক নিগ্রহেরই সাক্ষ্য দেয়।
বয়স ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা, হৃদ্রোগের জটিলতা এবং নানা শারীরিক প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে দিনের পর দিন কারাগারে কাটিয়ে দিতে হয়েছে। কেবল আইনি বেড়াজাল বা গ্রেপ্তারই নয়, বহুবার রাজপথে সভা-সমাবেশ করতে গিয়ে টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড এবং গাড়িবহরে হামলার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। এতসব মামলা, নির্যাতন আর কারাবাসের পরও রাজনীতি থেকে পিছিয়ে না গিয়ে ধীরস্থির ও সহনশীলতার সাথে দল পরিচালনা করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেকে রাজনীতিতে এক লড়াকু ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রেখেছেন।