জুলাই সনদে থাকা সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে। বিরোধী দলের আপত্তি উপেক্ষা করে গঠন করা জাতীয় সংসদের ‘সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ এ দিন প্রথম বৈঠকে বসতে যাচ্ছে। দুপুর ১২টা থেকে জাতীয় সংসদের কেবিনেট কক্ষে বৈঠকটি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি গঠন করে জাতীয় সংসদ। বিরোধী দল থেকে এই কমিটিতে পাঁচজনের নাম দেওয়ার অনুরোধ করেছিল সরকারি দল। তবে বিরোধী দল কারও নাম দেয়নি। কমিটি গঠনের দিন এ কমিটি প্রত্যাখ্যান করে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছিল বিরোধী দল। সেদিন বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান সংসদে বলেছিলেন, এ ধরনের কমিটি গঠনের বিষয়ে তাঁদের ধারণাগত মতপার্থক্য আছে। তাঁরা সংবিধান সংস্কার চান।
গত ১৪ জুলাই কমিটি গঠনের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী এই কমিটির কার্যপরিধি হলো—সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনের নিমিত্তে সুপারিশ প্রণয়নপূর্বক সংসদে রিপোর্ট পেশ। তবে, এ কমিটি কী কী কাজ করবে, কীভাবে করবে, তার প্রক্রিয়া এখনো ঠিক করা হয়নি বলে জানা গেছে। কত দিনের মধ্যে কমিটিকে সংসদে প্রতিবেদন দিতে হবে, সেটাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। প্রথম বৈঠকে কমিটির কর্মকৌশল নির্ধারণ করার কথা রয়েছে।
বিশেষ কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, প্রথম বৈঠকে কমিটি নিজেদের কর্মকৌশল ঠিক করবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিএনপির অঙ্গীকার আছে। এর বাইরেও বিএনপির নিজস্ব কিছু অঙ্গীকার আছে। সংবিধানে কী কী সংশোধন আনা যায়, তা নিয়ে বিশেষ কমিটি সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, গণমাধ্যমের সম্পাদকসহ সব স্তরের অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, তারপর কমিটি তাদের রিপোর্ট তৈরি করে তা সংসদে পেশ করবে। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইন মন্ত্রণালয় সংসদে বিল আনবে। সে বিলের ওপর আবার সংসদে আলোচনা হবে। তারপর বিল পাস হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের অক্টোবরের শুরুতে সংবিধান সংস্কার কমিশনসহ ছয়টি কমিশন করে। অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বে গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিশন অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা, জনমত জরিপসহ বিভিন্নভাবে নেওয়া মতামতের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি তাদের বিস্তারিত সুপারিশ সরকারের কাছে জমা দেয়। পরে ছয়টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দুই দফায় দীর্ঘ আলোচনা করে তৈরি করা হয় জুলাই জাতীয় সনদ। সেখানে ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান-সম্পর্কিত। সেগুলো সংবিধানে যুক্ত করার কথা রয়েছে।
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে (পিআর) সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন, উচ্চকক্ষের ক্ষমতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপদ্ধতি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া, প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধানসহ এ ধরনের কিছু প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তন আসবে। এর মধ্যে কিছু প্রস্তাবে ভিন্নমত ছিল বিএনপির। তারা নিম্নকক্ষের আসনের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠন এবং সার্চ কমিটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিয়োগে ব্যর্থ হলে সংসদের মাধ্যমে নিয়োগের পক্ষে। পিএসসি, দুদক ও ন্যায়পালের সাংবিধানিকভাবে নিয়োগসহ বেশ কিছু প্রস্তাবে আপত্তি ছিল দলটির। যেটা তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত বছরের নভেম্বরে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হয়েছিল। সেটার আলোকে সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিএনপির আপত্তি রাখা হয়নি। সেখানে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার পর বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের সমন্বয়ে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করার কথা ছিল। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দুটি শপথ নেওয়ার কথা ছিল। একটি সংসদ সদস্য হিসেবে, আরেকটি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। নির্বাচনের পরে জামায়াত দুটি শপথ নিলেও বিএনপির সদস্যরা একটি শপথ নেন। যার কারণে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি। এ নিয়ে সংসদ ছাড়াও রাজপথেও আন্দোলন করছে বিরোধী দল।