হোম > জাতীয়

মানবাধিকার কমিশন ও গুমের খসড়া আইন নিয়ে টিআইবির উদ্বেগ

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

অংশীজনদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত ও সুপারিশ উপেক্ষা করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ও গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেওয়ায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলেছে, পতিত কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে গুম-খুনসহ ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিজ্ঞতা থেকে সরকার কতটা শিক্ষা নিয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

আজ বুধবার এক লিখিত বিবৃতিতে আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের বিষয়ে টিআইবি বলেছে, দুটি খসড়ায় কিছু ইতিবাচক বিষয় থাকলেও মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতার পথে বড় বাধা তৈরি করতে পারে–এমন বেশ কিছু বিধান বহাল রাখা হয়েছে। একইভাবে গুমের অভিযোগে অভিযুক্ত শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি করতে পারে–এমন বিধানও রাখা হয়েছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অধিকাংশ অভিযোগই শৃঙ্খলাবাহিনী হিসেবে সংজ্ঞায়িত সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে। অথচ প্রস্তাবিত আইনে ২০০৯ সালের আইনের ১৮ ধারা প্রায় হুবহু রেখে এসব ঘটনায় কমিশনকে সরকার বা বাহিনীপ্রধানের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে।

ইফতেখারুজ্জামানের মতে, এই দুর্বলতার কারণেই কমিশন অতীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহি নিশ্চিত বা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ‘এ’ ক্যাটাগরির মর্যাদাও অর্জন করতে পারেনি।

কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের বাছাই কমিটিতেও সরকারের আধিপত্যের ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছে টিআইবি। প্রস্তাবিত কমিটিতে স্পিকার, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারদলীয় একজন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে রাখা হয়েছে। অন্য তিন সদস্যের অন্তত দুজনের মনোনয়নের ক্ষমতাও সরকারের হাতে থাকায় কমিশন নিয়োগে সরকারের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আশঙ্কা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।

এ ছাড়া পাঁচ সদস্যের কমিশনে নারী সদস্য এবং বাছাই কমিটিতে নারী প্রতিনিধিত্ব বাধ্যতামূলক না করায় উদ্বেগ জানিয়েছে টিআইবি। সংখ্যালঘু ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের বিষয়েও কোনো বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি বলে অভিযোগ সংস্থাটির।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, কমিশনকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বলা হলেও এটি সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের আওতামুক্ত থাকবে–খসড়ায় তা স্পষ্ট করা হয়নি। ঢাকার বাইরে কার্যালয় স্থাপন ও সাংগঠনিক কাঠামো নির্ধারণে সরকারের পূর্বানুমোদন, ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সরকারি কর্মচারীকে প্রেষণে নিয়োগ এবং সরকারি কর্মচারীকে কমিশনার করার সুযোগ কমিশনকে কার্যত সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পারে।

প্রথম খসড়ায় থাকা ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনে অজুহাত অগ্রহণযোগ্য’ বিধানটি বাদ দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি। একই সঙ্গে ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণের ঝুঁকি রয়েছে এমন স্থাপনা পূর্বঘোষণা ছাড়াই পরিদর্শনের ক্ষমতার আওতা থেকে ‘সামরিক আটক কেন্দ্র’ বাদ দেওয়ায় উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি। টিআইবির প্রশ্ন, এর মাধ্যমে কি ‘আয়নাঘর’ বহাল রাখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে?

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেছে টিআইবি। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তের দায়িত্ব মানবাধিকার কমিশনের বাইরে রেখে এককভাবে পুলিশের ওপর দেওয়া হয়েছে। অথচ গুমের অধিকাংশ ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তারা শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য।

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগের ক্ষেত্রে অধস্তন তদন্ত কর্মকর্তার ‘অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন’-এর ভিত্তিতে পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়া গেলে ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে তাঁকে কার্যধারা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ রাখার সমালোচনা করেছে টিআইবি। সংস্থাটির প্রশ্ন, এমন বিধান বাস্তবে গুমের বিচারহীনতা নিশ্চিত করবে কি না।

এ ছাড়া গুমের সংজ্ঞায় জনপ্রতিনিধি, মন্ত্রী বা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা অন্তর্ভুক্ত না করায়ও আপত্তি জানিয়েছে সংস্থাটি। ২০২৫ সালের গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশে মানবাধিকার কমিশনকে আটককেন্দ্র, কারাগার, হাজতখানা ও গোপন আটককেন্দ্র পরিদর্শনের যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, অনুমোদিত খসড়ায় তা রাখা হয়নি বলেও উল্লেখ করেছে টিআইবি।

সংস্থাটি বলেছে, স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধে আইনি সুরক্ষার অভাবে দেশের মানুষ যে ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হয়েছে, তার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে হবে। জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা, মানবাধিকার, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্য এবং সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটিয়ে সংসদে উত্থাপনের আগে খসড়া দুটি আইন ভুক্তভোগী ও অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে টিআইবি।