তীব্র জ্বালানি ও গ্যাস-সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেছেন, সরকারের লক্ষ্য ২০২৭ সালে কিছুটা স্বস্তি, ২০২৮ সালে আরও বেশি স্বস্তি ও ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে জ্বালানিসংকটমুক্ত পরিস্থিতি তৈরি করা।
আজ সোমবার জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের ‘তীব্র জ্বালানি ও গ্যাস-সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে বেকারত্ব সৃষ্টি ও দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক বিপর্যয় রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ’ বিষয়ে জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন ৬৮ বিধির নোটিশের ওপর আলোচনায় এসব কথা উঠে আসে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিগত দিনের ভুল নীতি, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে—আগামী বছর যেন এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা তার থেকে কিছুটা স্বস্তি অনুভব করতে পারি। ২০২৮-এ দাঁড়িয়ে যেন তার থেকে আরও একটু বেশি স্বস্তি অনুভব করতে পারি এবং ২০৩০ সাল নাগাদ যেন আমাদের মধ্যে কোনো সংকট কাজ না করে, সে ব্যাপারেই আমরা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি, যার নামই হচ্ছে ‘‘উই হ্যাভ আ প্ল্যান।’’’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বড়পুকুরিয়ায় অতিরিক্ত কয়লা থাকলেও দেশের অন্য প্রান্তে তা পরিবহনে ব্যয় বেশি হওয়ায় এখনই অন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রে তা ব্যবহার লাভজনক নয়। তবে ভবিষ্যতে উত্তরাঞ্চলে পরিবেশসম্মতভাবে কয়লা উৎপাদন বাড়ানো গেলে তা দেশের অন্যান্য অঞ্চলে নিতে প্রয়োজনীয় রেল অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
অফশোর গ্যাস অনুসন্ধানে গত ২৪ মে বিডিং রাউন্ড চালু হয়েছে, যার মেয়াদ ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। বিদেশি তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোকে এতে অংশ নিতে সরাসরি যোগাযোগ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি কূপের খনন চলছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে এসব কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে ২ হাজার ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা যাচ্ছে।
এ ঘাটতি মোকাবিলায় চলতি বছর অন্তত দুটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) চুক্তি ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আরও একটি এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এফএসআরইউ থেকে জাতীয় গ্রিডে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে। মাতারবাড়ীতে ল্যান্ড বেজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের প্রক্রিয়াও চলছে।
বিদ্যুৎ-সংকট মোকাবিলায় ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। এ জন্য ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বন্ধ রামপাল কেন্দ্রের ৬৬০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট দ্রুত চালুর আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ পাঁচটি কেন্দ্র থেকে ক্যাপাসিটি চার্জ ছাড়াই প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আগামী ছয় মাসে রুফটপ সোলার স্থাপনে মাত্র ১ শতাংশ শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫৫ পয়সায় কেনার সুযোগ রাখছে। এ ছাড়া মাতারবাড়ীতে ৭০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র ও উইন্ডমিল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি কিনতে গিয়ে অতিরিক্ত প্রায় ১৫ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
মিটারভাড়া প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘মিটারভাড়া যদি মওকুফ করে দিতে পারতাম, আমাদেরও ভালো লাগত। এটা নিয়ে আমরা যখন দীর্ঘ পর্যালোচনা করেছি, এই মিটারভাড়া যদি মওকুফ করতে হয়, তাহলে ২৯ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে।’ তিনি বলেন, কীভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মিটারভাড়া কমিয়ে আনা যায়, সে বিষয়ে সরকারের বিশ্লেষণ চলছে।
ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সমস্যা ছিল না বা নেই—এ কথা সরকার কখনো বলেনি; বরং সমস্যাগুলো সমাধানে প্রতিটি বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্রে ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, সেখানে একটি হটলাইন নম্বর দেওয়া হয়েছে এবং আলাদা ডেস্ক স্থাপন করা হয়েছে। ওই ডেস্ক এখনো কার্যকর রয়েছে।