মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি বা মক্কা প্যাক্টে যোগদানে বাংলাদেশ কোনো ঝুঁকি দেখছে না। একই সঙ্গে অন্য অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এই চুক্তি বাধা হয়ে দাঁড়াবে না বলেও জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (১) হুমায়ুন কবির।
আজ রোববার ঢাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফর বিন আবিয়াহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটি একটি ব্যতিক্রমী চুক্তি, যা নতুন নানা সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে। প্রস্তাবিত চুক্তিটিকে বাংলাদেশ ‘ইতিবাচক’ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা বর্তমানে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি এবং আমাদের সব দ্বিপক্ষীয় অংশীদারের সঙ্গেই এই আলোচনা ইতিবাচক গতিতে এগোচ্ছে।’
উল্লেখ্য, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ককে নিয়ে চলতি বছরের ৭ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ বা ‘মক্কা প্যাক্ট’ স্বাক্ষরিত হয়।
প্রস্তাবিত এই নিরাপত্তা জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের সম্ভাব্য কোনো কূটনৈতিক বা কৌশলগত ঝুঁকি সৃষ্টি হবে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী জানান, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রেখে ঢাকা একটি সমন্বিত ও নমনীয় পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতি অনুসরণ করবে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের মতো দেশকে অত্যন্ত সমন্বিত ও নমনীয় কৌশল নিয়ে পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার পথে এগোতে হবে। এই নমনীয় কৌশলের আলোকেই আমরা আমাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ভারসাম্য রক্ষা করব এবং এই প্রতিরক্ষা জোটে সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য কোনো ঝুঁকি তৈরি হবে না।’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বর্তমান অস্থির ও সংকটময় বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যে কোনো বিশেষ একটি সহযোগিতার ক্ষেত্রে যুক্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে, সেটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বিকল্পগুলোকে সীমিত করে ফেলবে কিংবা অন্য জোট ও সহযোগীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতে বাধা দেবে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আজকের এই সংকটপ্রবণ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সুনির্দিষ্ট কোনো একটি অঞ্চলে বা ক্ষেত্রে যুক্ত থাকার মানে অন্য কোনো জোট বা ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার সুযোগ হারিয়ে যাওয়া নয়। এটি আমাদের কাজের পরিধিকে মোটেই সংকুচিত করে না।’
আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতির কথা পুনরুল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, যেখানেই অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার মাধ্যমে শান্তি ও স্থিতিশীলতায় অবদান রাখার সুযোগ থাকবে, বাংলাদেশ সেখানেই যুক্ত থাকবে। বাংলাদেশ বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে। তাই, যেখানেই শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা প্রধান লক্ষ্য হবে, বাংলাদেশ সব সময় সেখানেই ভূমিকা রাখবে।
সম্প্রতি ওআইসির ২৩তম বিশেষ পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষদের (সিএফএম) বৈঠকে যোগ দিতে জেদ্দা সফরে যান প্রতিমন্ত্রী। সফরকালে তিনি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদসহ একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন।
জেদ্দায় এসব বৈঠকে প্রস্তাবিত মক্কা চুক্তি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না—জানতে চাওয়া হলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে সেখানকার নেতাদের প্রতিক্রিয়া ছিল ‘অত্যন্ত ইতিবাচক’।
তবে প্রতিমন্ত্রী এটিও জানান, এই জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পায়নি। তিনি বলেন, ‘যখন আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আমন্ত্রণপত্র আসবে, তখন আমরা অবশ্যই আপনাদের বিষয়টি জানাব।’
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নেতৃত্বস্থানীয় অবদান ও বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত নিরাপত্তা অভিযানের অভিজ্ঞতার কারণেই এই চুক্তির প্রতি ঢাকার মনোভাব ইতিবাচক বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘের কাঠামোর অধীনে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ অন্যতম প্রধান দেশ। শান্তি রক্ষা করা আমাদের জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়। এই ক্ষেত্রে আমাদের বিস্তৃত অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।’
বিষয়টি আরও ব্যাখ্যা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যদি বিশ্বজুড়ে শান্তিরক্ষা অভিযান পরিচালনা করতে পারি, তবে এখানে আমাদের মুসলিম ভ্রাতৃত্বের স্বার্থে ভূমিকা রাখতে পিছপা হব কেন?’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এই ময়দানে নতুন নই, শান্তিরক্ষা অভিযানে আমরা কোনো নবীন খেলোয়াড় নই। আমরা এই কাজের বিশেষজ্ঞ এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সবচেয়ে বেশি সেনা প্রেরণকারী দেশগুলোর একটি।’
সৌদি আরব যেহেতু দুটি পবিত্র মসজিদের হেফাজতকারী, তাই মুসলিম বিশ্বের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এমন একটি উদ্যোগে ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে সাড়া দেওয়াকে ‘একদমই খারাপ কিছু নয়’ বলে মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী।
এই চুক্তির বিষয়ে অগ্রগতি-সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, আলোচনা অত্যন্ত গঠনমূলকভাবে এগোচ্ছে এবং ভবিষ্যতে সম্পর্কের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি কেমন রূপ নেয়, তা সময়ই বলবে।
জেদ্দা সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বৈঠকটি ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ’ হয়েছে। বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়েও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া ওআইসি বৈঠকের ফাঁকে তিনি কাতার, কুয়েত ও মালদ্বীপের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিদের সঙ্গেও একাধিক বৈঠক করেন।
মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের ‘সুনামের চিহ্ন’ এখন সবচেয়ে জোরালো অবস্থানে রয়েছে উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশ এই সুসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী ও ফলপ্রসূ উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবে।