চাকরির প্রলোভন কিংবা অসুস্থতার সময় সরকারি সহায়তা দেওয়ার নাম করে শ্রমিক, দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষের ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা হয়। পরে সেই পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) থেকে ঋণের নামে প্রায় ৪৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়।
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, তাঁর স্ত্রী ও ইউসিবির সাবেক চেয়ারম্যান রুকমিলা জামানসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ওঠা এ অভিযোগে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
আজ রোববার দুদকের চট্টগ্রাম কার্যালয়ে কাগুজে প্রতিষ্ঠান খুলে ঋণের নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে পৃথক সাতটি মামলা করা হয় বলে নিশ্চিত করেছেন দুদকের উপপরিচালক মশিউর রহমান।
দুদক জানিয়েছে, সাতজন নিম্ন আয়ের মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে কাগুজে প্রতিষ্ঠান খুলে মোট ৪৬ কোটি ৭৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করে একটি চক্র। সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও রুকমিলা জামান ক্ষমতার অপব্যবহার করে এসব ঋণ জালিয়াতিতে সহায়তা করেন। এ ঘটনায় সাইফুজ্জামানের ভাই ও ইউসিবির সাবেক পরিচালক আনিসুজ্জামান চৌধুরী, আরেক ভাই আসিফুজ্জামান চৌধুরী, বোন রোকসানা জামান চৌধুরী এবং ব্যাংকটির সাবেক পরিচালক বশির আহমেদকে মামলার আসামি করা হয়েছে।
দুদকের তদন্ত অনুযায়ী, ইউসিবি ব্যাংকের চকবাজার শাখা থেকে হোছেন ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী দেখিয়ে মোহাম্মদ হোছেনের নামে ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা নেওয়া হয়। একই শাখা থেকে কর্ণফুলী এম্পোরিয়ামের স্বত্বাধিকারী দেখিয়ে নুরুল আলমের নামে ৬ কোটি ৯৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং জহির ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী দেখিয়ে মোহাম্মদ জহির উদ্দিনের নামে ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা নেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম পোর্ট শাখা থেকে ক্যাটস আই করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী দেখিয়ে দরজি মিজানুর রহমানের নামে ৬ কোটি ৯৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়। পাহাড়তলী শাখা থেকে শাহ ট্রেডিংয়ের কাগুজে স্বত্বাধিকারী দেখিয়ে শাহজাহানের নামে ৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়।
এ ছাড়া হারুন অ্যান্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী দেখিয়ে মো. হারুনুর রশিদের নামে ছয় কোটি টাকা এবং বহদ্দারহাট শাখা থেকে মল্লিক অ্যান্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী দেখিয়ে শ্রমিক অমিত মল্লিকের নামে ছয় কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়।
দুদক জানায়, কৃষক, দিনমজুর, দরজি ও সেলসম্যানদের ব্যবসায়ী দেখিয়ে সাতটি চলতি হিসাব খোলা হয়। এসব হিসাব ব্যবহার করে ঋণের নামে অর্থ লোপাট করা হয়।
এই সাতটি হিসাব ছাড়াও একই কৌশলে আরও অনেক হিসাব খুলে ইউসিবি ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ব্যাংকগুলো নিজেরাই গ্রাহক নির্বাচন করে থাকে এবং অভ্যন্তরীণ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে এবং এসব ঘটনায় পরিচালনা পর্ষদের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।’
গত ২১ সেপ্টেম্বর সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও রুকমিলা জামানের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হয়। এর আগে ১৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে রেড নোটিশ জারির আবেদন করে দুদক।
এদিকে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ও দুদকের যৌথ অনুসন্ধানে দিনমজুর, ভূমিহীন কৃষক, দরজি, নাপিত, ধোপা, রিকশাচালকসহ ৮৬ জনের নামে কাগুজে প্রতিষ্ঠান খুলে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া যায়।