হোম > জাতীয়

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর: বেতনের একাংশ ফেরত চাওয়া নিয়ে অসন্তোষ

সাইফুল মাসুম, ঢাকা 

পদায়নের দীর্ঘদিন পর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের বেতনের একাংশ কেটে রাখা নিয়ে অস্বস্তি ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ডিপ্লোমার মেয়াদের কমবেশির কারণে অর্থ বিভাগ এ ব্যবস্থা নিয়েছে। বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধানের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানিয়েছে। ডিপ্লোমা কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কাছে প্রতিকার চেয়েছে।

বিষয়টির সূত্রপাত এক বছর আগে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিন বছর ও চার বছরের ডিপ্লোমা ইস্যু সামনে এনে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রায় ছয় হাজার কৃষি কর্মকর্তার বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, ‘আদেশের অস্পষ্টতা থাকায় অসাবধানতাবশত কিছুসংখ্যক তিন বছর মেয়াদি কৃষি ডিপ্লোমাধারী উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে গ্রেড-১১ থেকে ১০-এ উন্নীত করা হয়েছিল। বর্তমানে তা বাতিল/সংশোধন করা হলো। অতিরিক্ত গৃহীত অর্থ আদায়ের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো।’

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগের সম্মতিতে ২০১৮ সালের ২২ অক্টোবর কৃষি ডিপ্লোমাধারী উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও সমমান পদের বেতন গ্রেড-১১ থেকে ১০-এ উন্নীত করার সরকারি আদেশ জারি করা হয়। কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে এ আদেশ জারির পর হিসাব সংরক্ষণ অফিসে মন্ত্রণালয়টির আওতাধীন সব দপ্তর ও সংস্থায় কর্মরত তিন বছর ও চার বছর মেয়াদি কৃষি ডিপ্লোমাধারী উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের উন্নীত বেতন গ্রেড কার্যকর করা হয়। কিন্তু অর্থ বিভাগ পদায়নের প্রায় সাত বছর পর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এক আদেশ জারি করে তিন বছর মেয়াদি কৃষি ডিপ্লোমাধারীদের পদ অবনমন করে টাকা ফেরত চাওয়া হয়।

ডিএইয়ের তথ্য বলছে, ২০১৮ সালে পদায়ন পাওয়া তিন বছর মেয়াদি কৃষি ডিপ্লোমাধারীদের মধ্যে বর্তমানে ৪ হাজার ৬১ জন কর্মরত রয়েছেন। একই বছর পদায়ন পাওয়া ১ হাজার ৮৬৫ জন তিন বছর মেয়াদি কৃষি ডিপ্লোমাধারী উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ইতিমধ্যে চাকরি থেকে অবসরে গেছেন। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, পদায়নের সাত বছর পর সরকারের এমন সিদ্ধান্তে তাঁরা বিব্রত হয়েছেন।

ঢাকায় ডিএইয়ের উপসহকারী প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিন বছর মেয়াদি ডিপ্লোমাধারী মোহাম্মদ রুহুল আমিন। তিনি সম্প্রতি চাকরি থেকে অবসরে গেছেন। রুহুল আমিন আজকের পত্রিকাকে জানান, ২০১৮ সালে তাঁর চাকরি ১০ম গ্রেডে উন্নীত করা হলেও এখন পেনশন বা অবসর ভাতা দেওয়া হয়েছে ১১ গ্রেডের হিসাবে। এতে এককালীন অবসর ভাতা তিনি দুই লাখ ৭৮ হাজার টাকা কম পেয়েছেন।

২০১৮ সালে দশম গ্রেডে পদায়ন পাওয়া আরেক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা কাজী আল আমিন। তিনি বর্তমানে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় কর্মরত রয়েছেন। আজকের পত্রিকাকে আল আমিন জানান, অর্থ বিভাগের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে আগের তুলনায় চার হাজার টাকা কম বেতন দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশে ৯০ দশকে ৩ বছর মেয়াদি কৃষি ডিপ্লোমা (ডিপ্লোমা ইন এগ্রিকালচার) কোর্সটি শুরু হয়েছিল। ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষে এই ডিপ্লোমা কোর্সকে ৪ বছর মেয়াদে উন্নীত করা হয়। তবে ২০০৭ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো কারিগরি বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যানের চিঠিতে বলা হয়, কারিগরি বোর্ডের একাডেমিক নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত তিন বছর ও চার বছর মেয়াদি কৃষি ডিপ্লোমা সমমানের।

ডিপ্লোমা কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (ডিকেআইবি)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি জিয়াউল হায়দার পলাশ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘একই পদে দুটি স্কেল হতে পারে না। ডিপ্লোমা ইস্যুতে যদি অর্থ বিভাগের নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে জুনিয়র পাবে বেশি টাকা। আর একই গ্রেডে থেকে সিনিয়র পাবে কম টাকা। এটা শুধু অর্থের বিষয় নয়, এর মাধ্যমে সিনিয়রদের অসম্মান করা হবে।’

ডিকেআইবির এই নেতা আরও বলেন, ‘আমরা মনে করি, উপসহকারীদের দমিয়ে রাখার জন্য কোনো একটি গোষ্ঠী অর্থ বিভাগকে বিভ্রান্ত করছে। এটার সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে আমরা চিঠি দিয়েছি। সোজা পথে সমাধান না হলে আমরা আন্দোলনে যাব।’

জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘তিন ও চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা নিয়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মধ্যে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা কেটে যাবে। এ বিষয়ে সমাধানের জন্য আমরা ইতিমধ্যে অর্থ বিভাগকে চিঠি দিয়েছি।’

অর্থ বিভাগের সচিব মো. খায়রুজ্জামান মজুমদারকে আজকের পত্রিকা থেকে একাধিকবার কল ও বার্তা দিলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলে গত ৪ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, কৃষি ডিপ্লোমাধারী উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা/সমমানের পদধারীদের গ্রেড-১১ থেকে গ্রেড-১০-এ উন্নীতকরণে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্মতি দিয়েছিল। পরবর্তীতে অর্থ বিভাগ ‘সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে: এসএসসি পাসসহ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে চার বছর মেয়াদি কৃষি ডিপ্লোমাধারী’ শর্ত আরোপ করেছে। এ শর্তটি কর্মরত তিন বছর মেয়াদি কৃষি ডিপ্লোমাধারী উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা/সমমানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কি না, তা স্পষ্ট করা বা শর্তটি শিথিল ও সংশোধনের এখতিয়ার অর্থ বিভাগের।

এর আগে গত ২১ এপ্রিল কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে লেখা এক চিঠিতে অর্থ বিভাগের দেওয়া শর্ত শিথিল করার বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়।