সদ্য বিদায় নেওয়া আগস্ট মাসে আগের মাসের তুলনায় রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়েছে। সারা দেশে আগস্টে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় সাতজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৫৩৬ জন।
মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)’–এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। আজ বৃহস্পতিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশের বিষয়টি জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) সংগৃহীত তথ্য ও ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের আগস্ট মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে ৭০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭ জন এবং আহত হয়েছেন ৫৩৬ জন। এই মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা ও হতাহতের সংখ্যা জুলাইয়ের তুলনায় বেড়েছে। গত জুলাইয়ে ৪৫টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হন ছয়জন, আহত হন ১৬৪ জন।
আগস্টে সহিংসতার অন্তত ৭০টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তঃকোন্দলে ২০টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন পাঁচজন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৫২ জন। বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ১৮টি সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত হয়েছেন একজন, আহত হয়েছেন ২৩৩ জন। বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে ৭টি সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত হয়েছেন একজন, আহত হয়েছেন ২৬ জন। বিএনপি-এনসিপির মধ্যে ৬টি সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৬ জন। বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে ১০টি সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩৮ জন। এ ছাড়া বিভিন্ন দলের মধ্যে ৯টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৭১ জন। নিহত ৭ জনের মধ্যে বিএনপির ৫ জন, আওয়ামী লীগের ১ জন ও জামায়াতের ১ জন সদস্য রয়েছেন।
এসব ঘটনার মধ্যে ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের অন্তত ১৩টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ২১৬ জন। এর মধ্যে ছাত্রদল-শিবিরের মধ্যে আটটি ঘটনায় ১৮১ জন এবং ছাত্রদল, অন্যান্য ছাত্রসংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫টি ঘটনায় ৩৫ জন আহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও হামলা, দলীয় অন্তঃকোন্দল এবং চাঁদাবাজিকেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা, গুলি এবং দেশের কয়েকটি জেলায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।’
পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর দুষ্কৃতিকারীদের হামলার অন্তত চারটি ঘটনায় দুজন নিহত এবং তিনজন আহত হয়েছেন। অন্তত ১২ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ ছাড়াও সারা দেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজিকেন্দ্রিক ১৯টি ঘটনায় অর্ধশতাধিক বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থী ও তাঁদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতা ও হামলার ঘটনাও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। আগস্টে কুষ্টিয়া ও সাতক্ষীরায় স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে অন্তত ৯ জন আহত হয়েছেন।
রাজনৈতিক মামলার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, আগস্টে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের নামে ৬২টির বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১ হাজার ১২৫ জনের নামোল্লেখ করে এবং আরও প্রায় ২ হাজার ২০৯ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক ও অন্যান্য মিলিয়ে মোট ১৬২টি ঘটনায় ১২ হাজার ৮২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ৪২৯ জন নেতা-কর্মী, বিএনপির ২২ জন, জামায়াতে ইসলামীর ৪ জন, এনসিপির ৯ জন এবং উগ্রপন্থী সংগঠনের ৫ জন সদস্য রয়েছেন।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, আগস্টে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার কমপক্ষে ৫৩টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ২৮ জন, আহত হয়েছেন ৬২ জন।
আগস্টে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার তথ্য উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ মাসে অন্তত ৩২টি ঘটনায় কমপক্ষে ৪৫ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২৬ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ৬ জন, হুমকি পেয়েছেন ৭ জন সাংবাদিক। ৫ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া সংবাদ প্রকাশের জেরে একটি মামলায় একজন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬-এর আওতায় একটি মামলায় একজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
সভা-সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, আগস্টে ১৩টি সভা-সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা দিয়েছে। এতে ৬১ জন আহত হয়েছেন এবং আটজনকে আটক করা হয়েছে।
এ ছাড়া আগস্টে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অন্তত ৮টি ঘটনায় ১০ জনকে আটক ও আটটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ১১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬-এর বিভিন্ন ধারায় পৃথক চারটি মামলায় ৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ৫ জনকে আটকও করা হয়েছে।
কারাগারে মৃত্যুর বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, আগস্টে সারা দেশে কারাগারে কমপক্ষে ছয়জন আসামি মারা গেছেন। এর মধ্যে একজন কয়েদি এবং ৫ জন হাজতি।
সারা দেশে নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থানে দুর্বৃত্তদের হাতে পরিকল্পিত বা অপরিকল্পিতভাবে হতাহতের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, আগস্টে নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থানে দুর্বৃত্তদের হাতে পরিকল্পিত বা অপরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ডের ৮২টি ঘটনায় ৮৭টি লাশ উদ্ধার হয়েছে।
সীমান্তে হতাহত ও আটকের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, আগস্টে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে আটটি ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় নিহত হয়েছেন ২ জন, আহত হয়েছেন একজন। তাঁরা সবাই গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ ছাড়া সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ৫ জনকে আটক এবং বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ৫ জনকে পুশ ইন ও ১৮ জনকে পুশ ইনয়ের চেষ্টা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে একজন বাংলাদেশি নিহত, একজন আহত এবং তিনজনকে জলসীমা থেকে আটক করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আগস্টে অন্তত ৮৪টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৯ জন, আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৬৭ জন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৩ জন শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন। এ ছাড়া পৃথক দুটি ঘটনায় দুজন গৃহকর্মীর মৃত্যু ও একজন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
আগস্টে ২৪৯ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই ২৪৯ জনের মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ৭৯ জন, যাদের মধ্যে ৪৬ জন ১৮ বছরের কম বয়সী। ৯৩ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৩৮ জনই শিশু। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ছয়জন, আহত হয়েছেন সাতজন এবং আত্মহত্যা করেছেন একজন। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৪৯ জন, আহত হয়েছেন ৩১ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ২৩ জন নারী।
আগস্টে ২৮২ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ৭৭ জন প্রাণ হারিয়েছে। এ ছাড়া ২০৫ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।