আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে সরকারের জুলুম নির্যাতন ও হেফাজতের ওপর সরকারের গণহত্যার বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখালেখির কারণে গুম করা হয়েছিল। জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত– এমন স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতন করা হতো আটকের পর। একদিন ‘জঙ্গি নাটক মঞ্চস্থ’ করে সাংবাদিকদের সামনে আনা হয়। পরবর্তীতে সন্ত্রাস দমন আইন, বিস্ফোরক দ্রব্য ও অস্ত্র আইনে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয় বলে জানিয়েছেন গুমের শিকার হওয়া তাজুল ইসলাম সুমন নামে এক ভুক্তভোগী।
আজ বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন গুমের শিকার তাজুল ইসলাম সুমন। আট বছর কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি মেলে। একটি মামলা থেকে খালাস পেলেও দুটি মামলা চলমান বলে জানান তিনি।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) গুম করে রাখার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ষষ্ঠ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তাজুল ইসলাম। তিনি নিজেকে হেফাজত কর্মী ও বর্তমানে কৃষক বলে উল্লেখ করেন।
সুমন বলেন, সরকারের জুলুম নির্যাতন ও হেফাজতের ওপর সরকারের গণহত্যার বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখালেখির কারণে ২০১৫ সালের ৪ নভেম্বর মধ্যরাতে মানিকগঞ্জের মাদ্রাসা থেকে ফোন করে বাইরে যেতে বলে। মাদ্রাসার বাইরে গেলে নিয়ে আটক করে নিয়ে যায় তাকে।
সুমন বলেন, তাকে প্রথমে যেখানে রাখা হয় ওই কক্ষটি ছিল প্রায় ৮/১১ ফুট। উচ্চতা ১৩/১৪ ফুট। রুমের ভেতরে দুটি লাইট ছিল। একটি স্বাভাবিক এবং অন্যটি ১ হাজার ভোল্টের। সেখানে সাড়ে সাত মাস আটক রাখা হয়। সেখানে থাকাবস্থায় তিনি কাফরুল মসজিদের মাইকের আওয়াজ শুনতে পেতেন। কারণ বিভিন্ন সময় স্থানীয় লোকজনের মৃত্যু সংবাদ মাইকে প্রচারের সময় পূর্ব কাফরুল এলাকার নাম উল্লেখ করা হতো। মাঝে মাঝে বিমান ওঠা নামার আওয়াজও শুনতে পেতেন। তবে যখন মাইকে ঘোষণা হতো তখন এগজস্ট ফ্যান চালু করে দেওয়া হতো।
সুমন জবানবন্দিতে বলেন, ২০১৬ সালের ১৫ রমজান অন্য একটি স্থানে নিয়ে আনুমানিক ৪০ দিন রাখা হয়। এরপর সেখান থেকে নিয়ে অন্য একটি স্থানে আটক রাখা হয়। ওই রুমটি ছিল ৪/৮ ফুট। সেখানে তিন রুমের জন্য সামনে বড় একটি জিএফসি স্ট্যান্ড ফ্যান ছিল। ওই ফ্যানের পা–দানিতে ‘র্যাব-৪’ লেখা ছিল। এ ছাড়া টয়লেটের জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে ‘র্যাব-৪’ লেখা গাড়ি দেখা গেছে। সেখানে প্রায় সাড়ে চার মাস রাখা হয়। পরবর্তীতে সেখান থেকে নিয়ে অপর একটি স্থানে রাখা হয়। সেখানে আটক অপর একজনের কাছ থেকে এটি ‘র্যাব-১০’ বলে জানতে পারেন। পরদিন ৭/৮ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় অন্য একটি স্থানে। ৮ দিন পর সেখান থেকে নিয়ে চট্টগ্রাম আকবর শাহ থানার কর্নেল হাট এলাকায় সানজিদা এন্টারপ্রাইজের সামনে গাড়ি থেকে নামিয়ে অস্ত্র উদ্ধারের নাটক সাজিয়ে আবারও গাড়িতে তোলা হয়।
জঙ্গি নাটকের বর্ণনা দিতে গিয়ে সুমন বলেন, অস্ত্র উদ্ধারের ‘নাটকের’ পর তাদের নিয়ে একটি নির্মাণাধীন বাড়ির দোতলায় একটি রুমে নিয়ে আটকে রাখা হয়। তখন আশপাশ দিয়ে র্যাবের গাড়ির হুইসেল বাজতে থাকে। এভাবে ৩–৪ ঘণ্টা ‘জঙ্গি নাটক’ মঞ্চস্থ করে বাড়ি থেকে বের করে সাংবাদিকদের সামনে আনা হয়। তারপর র্যাব-৭ এ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ২০১৬ সালের ৮ ডিসেম্বর আকবর শাহ থানায় সোপর্দ করা হয়। পরদিন আদালতের মাধ্যমে পাঠানো হয় কারাগারে। কারাগারে থাকাবস্থায় তিন দিন পুলিশ হেফাজতে এবং তিন দিন র্যাব হেফাজতে রিমান্ডে নেওয়া হয়। র্যাব হেফাজতে রিমান্ডে থাকাবস্থায় এএসপি রুহুল আমীন জানান, তাকে ডিজিএফআই তুলে এনেছে।
তিনি গুম, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা এবং কারাভোগের সঙ্গে জড়িতদের এবং শেখ হাসিনা, তার সামরিক উপদেষ্টা তারিক সিদ্দিকীর বিচার দাবি করেন।
এই মামলায় ১৩ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজহার সিদ্দিকী। আর পলাতক আসামিরা হলেন–সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা, মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিকী (অব.), লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. আকবর হোসেন (অব.), মেজর জেনারেল মো. সাইফুল আবেদিন (অব.), লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. সাইফুল আলম (অব.), লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী (অব.), মেজর জেনারেল হামিদুল হক (অব.), মেজর জেনারেল মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম (অব.), মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মখচুরুল হক (অব.)