হোম > জাতীয়

সুপ্রিম কোর্টের উন্নয়নে প্রথমবার বরাদ্দ ১০০ কোটি টাকা, নেই খরচের এখতিয়ার

এস এম নূর মোহাম্মদ, ঢাকা 

ফাইল ছবি

সুপ্রিম কোর্টের উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। তবে সেই অর্থ খরচের এখতিয়ার দেওয়া হয়নি সুপ্রিম কোর্টকে। তাই সব ধরনের প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব ৫০ টাকা পর্যন্ত প্রধান বিচারপতিকে ক্ষমতা দিতে এবং প্রয়োজনীয় পরিপত্র জারি করতে চিঠি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন।

গত ১৭ আগস্ট পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর পাঠানো হয় ওই চিঠি। চিঠিতে অতীব জরুরি লেখা রয়েছে। তবে এক মাসের বেশি সময় পার হলেও বিষয়টি এখনো সুরাহা হয়নি। ওই চিঠির বিষয়টি সুরাহা না হওয়ায় বরাদ্দের পরও কোনো অর্থ খরচ করতে পারছে না সুপ্রিম কোর্ট। আর খরচ করতে না পারলে বছর শেষে ওই অর্থ ফেরত যাবে সরকারের কাছে।

অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল আজকের পত্রিকাকে বলেন, প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের একটির প্রধান। প্রধান বিচারপতির অবশ্যই আর্থিক সক্ষমতা থাকা উচিত। প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা থাকলে তা দ্রুত নিরসনের পরামর্শ দেন রাষ্ট্রের এই প্রধান আইন কর্মকর্তা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের অধস্তন আদালতের বর্তমান অবকাঠামোর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় ও জরাজীর্ণ। অনেক ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সুপ্রিম কোর্ট ও অধস্তন আদালতে তথ্য প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নেই বললেই চলে। ভবনের অভাবে মামলার আলামত ও বিচারিক নথি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এজলাস সংকটের কারণে বিচারকদের এজলাস ভাগাভাগি করতে হয়। এতে বিচারকদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। অথচ প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধনের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের কোনো প্রতিনিধি না থাকায় বরাদ্দ পেয়েও কোনো অর্থ খরচ করা সম্ভব হচ্ছে না।

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে গত ২২ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল বরাবর চিঠি পাঠিয়ে অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি জানানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, বিচার বিভাগের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পরিকল্পনা কমিশনের অনুকূলে ‘বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা’ খাতে জিওবি বাবদ সংরক্ষিত বরাদ্দ থেকে সুপ্রিম কোর্টের উন্নয়ন বাজেটে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের বিষয়ে অর্থ বিভাগের নীতিগত সম্মতি নির্দেশক্রমে জানানো হলো। তবে শর্ত থাকে যে, প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা বিভাগ কর্তৃক জারিকৃত ‘সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকা-২০২২’ এবং বিদ্যমান আর্থিক বিধি-বিধান অনুসরণ করতে হবে।

সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ নিয়ে ২০২২ সালে পরিকল্পনা বিভাগ কর্তৃক জারিকৃত পরিপত্রে বলা হয়, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন সচিবালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আওতায় গৃহীত/বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের ক্ষেত্রে যথাক্রমে স্পিকার, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান এবং দুদক চেয়ারম্যান ডিপিইসি/ডিএসপিইসি’র সুপারিশক্রমে অনুরূপ প্রস্তাব অনুমোদন করবেন।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবিএম আলতাফ হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, বাজেট প্রণয়ন ও প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের না থাকাটা মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পরিপন্থী। প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগের প্রধান হিসেবে তাঁর ‘আনলিমিটেড’ ক্ষমতা থাকা উচিত। যাতে তিনি প্রয়োজন অনুপাতে প্রকল্প নিতে পারেন। সুপ্রিম কোর্ট নিজেই বিধি তৈরি করে খরচ করতে পারেন। তবে যেহেতু সুপ্রিম কোর্ট চিঠি দিয়েছে, তাই সেই আলোকে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। যেখানে সুপ্রিম কোর্টের প্রতিনিধি নেই সেখানে রাখা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

২০২২ সালে পরিকল্পনা বিভাগ কর্তৃক জারিকৃত পরিপত্রে তিন ধরনের প্রকল্পের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—বিনিয়োগ প্রকল্প চিহ্নিতকরণ ও প্রণয়ন এবং কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ও কারিগরি প্রকল্প। প্রস্তাবিত বিনিয়োগ প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত হলে অনুমোদনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রীকে। আর ৫০ কোটি টাকার বেশি হলে তা পাঠাতে হবে একনেকে।

পরিপত্রে আরও বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত সংশোধিত সমীক্ষা প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় অনুমোদিত ব্যয়ের ২০ শতাংশ বা ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত হ্রাস/বৃদ্ধি হলে বিভাগীয় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (ডিপিইসি) সুপারিশক্রমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী অনুমোদন করবেন। বৈদেশিক অর্থায়ন এবং জিওবি অর্থসহ কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় অনূর্ধ্ব ১০ কোটি টাকা এবং জিওবি অর্থের পরিমাণ মোট প্রাক্কলিত ব্যয়ের ৩০ শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকলে সেই প্রকল্পের অনুমোদন দেবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ।

সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণের প্রকল্প যাচাই কমিটিতে সাত সদস্যের মধ্যে প্রধান থাকেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সিনিয়র সচিব বা সচিব। প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটিতে (পিইসি) ১৪ সদস্যের মধ্যে প্রধান থাকেন পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের একজন সদস্য। বিভাগীয় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটিতে (ডিপিইসি) ১৪ সদস্যের মধ্যে প্রধান থাকেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সিনিয়র সচিব বা সচিব। বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটিতে (এসপিইসি) ১৪ সদস্যের মধ্যে প্রধান থাকেন পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের একজন সদস্য। বিভাগীয় বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটিতে (ডিএসপিইসি) ১৫ সদস্যের মধ্যে প্রধান থাকেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বা সচিব। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) ১৩ সদস্যের মধ্যে প্রধান থাকেন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার প্রধান অথবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের পরিকল্পনা বা উন্নয়ন অনুবিভাগের প্রধান। এ ছাড়া প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) ১৫ সদস্যের মধ্যে প্রধান থাকেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সিনিয়র সচিব বা সচিব।

২০২২ সালে পরিকল্পনা বিভাগ কর্তৃক জারিকৃত পরিপত্রে সিইসি, পিএসসি চেয়ারম্যান ও দুদক চেয়ারম্যানকে প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষমতা দিলেও নাম নেই বিচার বিভাগের প্রধানের। এ ছাড়া সাতটি কমিটির কোথাও সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রির কোনো প্রতিনিধিকে রাখা হয়নি। এতে করে সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রির কোনো কর্মকর্তা কোনো প্রকল্প অনুমোদন কমিটিতে থাকতে পারছেন না। নিজেরাও প্রকল্প অনুমোদন করার সুযোগ পাচ্ছেন না। যার কারণে সুপ্রিম কোর্টের অনুকূলে প্রথমবারের মতো উন্নয়ন প্রকল্পে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও তা কোনো কাজেই আসছে না।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশে ৫০ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল প্রধান বিচারপতিকে। কিন্তু বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বাতিল করে।

এদিকে অর্থ খরচ করতে জটিলতা নিরসনে গত ১৭ আগস্ট পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর চিঠি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। চিঠিতে বলা হয়েছে, বিচার বিভাগের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পরিকল্পনা কমিশনের অনুকূলে সুপ্রিম কোর্টের উন্নয়ন বাজেটে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যেখানে সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকা-২০২২ এবং বিদ্যমান আর্থিক বিধি-বিধান অনুসরণপূর্বক প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের বিষয় উল্লিখিত হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব এস এম শাকিল আখতার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট থেকে একটি চিঠি পেয়েছি। সুপ্রিম কোর্টের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে আমরাও চাই। কেননা সুপ্রিম কোর্টে পৃথক সচিবালয় না থাকায় তাঁরা কোনো প্রকল্প গ্রহণ করতে পারছেন না। আমরা এই বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়ে চিঠি দিয়েছি। আইন মন্ত্রণালয় পজিটিভ মতামত দিলে আমরা পরিপত্র সংশোধন করে দেব। এর মধ্যে না হলে আগামী মাসে ন্যাশনাল ইকোনমিক কাউন্সিলের সভা আছে। সেখানে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব। আশা করছি বিষয়টি এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে সমাধান হয়ে যাবে।’

সুপ্রিম কোর্টের চিঠিতে বলা হয়েছে, ওই নির্দেশিকায় বিচার বিভাগের সার্বিক উন্নয়ন তথা সুপ্রিম কোর্ট ও অধস্তন আদালতের উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধনের জন্য প্রধান বিচারপতিকে আর্থিক ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। সেই সঙ্গে বিভিন্ন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক কাঠামো অর্থাৎ রেজিস্ট্রির স্বকীয়তা বিবেচনায় নিয়ে সভাপতি/প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। জনগণের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিতকল্পে স্বল্প সময়ে ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য ‘সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকা ২০২২ ’-এ বর্ণিত কমিটির পরিবর্তে সংশোধিত আকারে কমিটি গঠন করা প্রয়োজন।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো সুপ্রিম কোর্টের চিঠিতে সব ধরনের প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব ৫০ কোটি টাকা ব্যয় পর্যন্ত প্রধান বিচারপতিকে ক্ষমতা দিতে বলা হয়। সেই সঙ্গে প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধনের জন্য প্রস্তাবিত সাধারণ বিষয়, কমিটি ও কার্যপরিধি সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় পরিপত্র জারির বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হয়।

তবে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রির কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি।