দেশের স্থলভাগের একাধিক ব্লকে তেল- গ্যাস উন্নয়নে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক জ্বালানি ও পেট্রোলিয়াম কোম্পানি শেভরন। কোম্পানিটি ইতিমধ্যে সরকারের কাছে তাদের আগ্রহপত্রও জমা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে শেভরনের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল সাক্ষাৎ করেও আগ্রহ জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীও কোম্পানিটির বিনিয়োগ আগ্রহকে স্বাগত জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দেশে চলমান গ্যাস-সংকটের মধ্যে শেভরন এই আগ্রহ দেখানোয় স্থলভাগের একাধিক ব্লক ইজারা পেতে পারে। তবে এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং শেভরনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি।
শেভরন বাংলাদেশ বর্তমানে তিনটি ব্লক থেকে গ্যাস উত্তোলন করছে। এগুলো হলো ১২ নম্বর ব্লকের বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র, ১৩ নম্বর ব্লকের জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্র এবং ১৪ নম্বর ব্লকের মৌলভীবাজার গ্যাসক্ষেত্র।
পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের সূত্র বলছে, শেভরন সুনামগঞ্জ, শেরপুর ও ময়মনসিংহ এলাকা নিয়ে গঠিত ১১ নম্বর ব্লক এবং হবিগঞ্জে অবস্থিত ১২ নম্বর ব্লকের ৬ হাজার ৬০০ বর্গকিমি এলাকায় তেল-গ্যাস উন্নয়নের আগ্রহ দেখিয়েছে।
দেশে তীব্র গ্যাস-সংকট চলছে। দৈনিক ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে প্রায় দুই মাস পর গতকাল মঙ্গলবার সর্বোচ্চ ২ হাজার ৬১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের কথা জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। গত ২১ জুলাই সাগরে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি অগ্নিকাণ্ডের পর বন্ধ হওয়ায় এবং গত আগস্টে পরিকল্পনায় থাকা এলএনজির ১০ কার্গোর মধ্যে চারটি কম আসায় একপর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ ১ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে গিয়েছিল। বর্তমানে সরবরাহ করা গ্যাসের মধ্যে প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চড়া দামে কেনা এলএনজি। সম্প্রতি এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮ মার্কিন ডলার হওয়ায় এর থেকে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম ৭৫-৮০ টাকা পড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অথচ দেশীয় কূপ থেকে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম ৫ থেকে ৬ টাকা।
গ্যাস-সংকটের কারণে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে লোডশেডিং বেড়েছে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে স্থলভাগের দুটি ব্লকে উন্নয়নে আগ্রহ দেখিয়েছে শেভরন। পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, শেভরন স্থলভাগের ১১ নম্বর ব্লক এবং ১২ নম্বর ব্লকের ৬ হাজার ৬০০ বর্গকিমি এলাকায় তেল-গ্যাস উন্নয়নের আগ্রহ দেখিয়েছে। মৌখিক আলোচনার পাশাপাশি লিখিত প্রস্তাবও তারা জমা দিয়েছে। ১১ নম্বর ব্লকটি সুনামগঞ্জ, শেরপুর ও ময়মনসিংহ এলাকা নিয়ে গঠিত এবং ১২ নম্বর ব্লক হবিগঞ্জে।
তবে উৎপাদন ও বণ্টন চুক্তি কীভাবে হবে কিংবা গ্যাসের অংশীদারত্ব ও দাম কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, সে বিষয়টি পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের ওই কর্মকর্তাদের কেউ স্পষ্ট করে বলতে পারেননি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে গত রোববার সাক্ষাৎ করে শেভরনের বেস অ্যাসেটস ও উদীয়মান দেশবিষয়ক প্রেসিডেন্ট জাভিয়ার লা রোসার নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল। সাক্ষাৎকালে তারা বাংলাদেশে আরও বেশি কূপ খনন ও বিনিয়োগে আগ্রহ জানায়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা এবং ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে শেভরনের বিনিয়োগ আগ্রহকে স্বাগত জানান।
বাপেক্সের একজন কর্মকর্তা জানান, শেভরন বাপেক্সকে সঙ্গে রেখেই স্থলভাগের কিছু এলাকায় কূপ উন্নয়নকাজ করার প্রস্তাব দিয়েছে বলে শুনেছেন। তবে জ্বালানি বিভাগ থেকে সরাসরি কোনো প্রস্তাব না আসায় সঠিক করে কিছু বলতে পারছেন না।
এ বিষয়ে জানতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং সচিব জিয়াউল হকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে পাওয়া যায়নি। বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী ফজলুল হকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে অপারগতা জানান।
এদিকে শেভরনকে কোন প্রক্রিয়ায় কয়টি ব্লক ইজারা দেওয়া হবে, রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বাপেক্স কতটা সংশ্লিষ্ট থাকবে, এসব নিয়ে জ্বালানি অধিকারকর্মীদের পাশাপাশি বাপেক্সের কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
নতুন বিনিয়োগ কিংবা ব্লক ইজারার বিষয়ে শেভরনও মুখ খুলছে না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শেভরন বাংলাদেশের মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন কর্মকর্তা শেখ জাহিদুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, জ্বালানি খাতে আরও অবদান রাখার জন্য শেভরন সরকারের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে। কোম্পানি তার ব্যবসায়িক কৌশলের অংশ হিসেবে বাণিজ্যিক বিষয়গুলো প্রকাশ করে না।
শেভরন বর্তমানে তিনটি ব্লক—১২ নম্বর ব্লকের বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র, ১৩ নম্বর ব্লকের জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্র এবং ১৪ নম্বর ব্লকের মৌলভীবাজার গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করছে। এসব গ্যাসক্ষেত্রের ৩৮টি সক্রিয় কূপ থেকে কোম্পানিটি দৈনিক ৮৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করছে। দেশের গ্যাসক্ষেত্র থেকে মোট গ্যাস উৎপাদন দিনে ১ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট। নতুন করে শেভরন যেসব এলাকার প্রস্তাব করেছে, সেগুলোর মধ্যে রশিদপুর, ছাতক, সুনেত্রসহ কয়েকটি প্রমাণিত গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে।
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম আজকের পত্রিকাকে বলেন, দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্থলভাগের গ্যাস অনুসন্ধান খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। শেভরন দীর্ঘদিন বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করা বহুজাতিক কোম্পানি। তাই স্থলভাগে তাদের সঙ্গে যদি আলোচনার মাধ্যমে ভালো কোনো দাম ঠিক করা যায়, সেটা দেশের জন্যও ভালো হবে। কারণ, এ মুহূর্তে পিএসসি অনুযায়ী দরপত্র আহ্বান করলে তা চূড়ান্ত করতে এক বছর লেগে যাবে। নতুন কোনো কোম্পানি কাজ পেলে তাদের স্থির হতেও এক বছর লেগে যাবে।
কী প্রক্রিয়ায় দাম ঠিক করা হবে, জানতে চাইলে ম তামিম বলেন, এটা মন্ত্রিসভার ব্যাপার। তবে এখন স্থলভাগের জন্য যে পিএসসি প্রস্তুত হচ্ছে, সেখানে ব্রেন্ট ক্রুডের ৮ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে বলে শুনছেন। এটা হলে বুঝতে হবে, দামটা ৮ শতাংশের আশপাশেই হবে, এর কম নয়।