মাঝারি তাপমাত্রার আবহাওয়ার মধ্যেও সারা দেশে বিদ্যুতের লোডশেডিং গড়ে আড়াই হাজার মেগাওয়াটের ওপরে অবস্থান করছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ বিভাগের এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি মাসের শুরুর দিকে গ্যাসের তীব্র সংকটকালীনের মতোই লোডশেডিং ঘণ্টায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। সাধারণত গ্রাম এবং মফস্বল শহরের ওপরই লোডশেডিংয়ের মূল ধাক্কা গেলেও এবার রাজধানীবাসীকেও ভুগতে হচ্ছে। বিদ্যুতের অভাবে ঢাকা শহরে বিভিন্ন এলাকায় পালা করে দিনে চার থেকে পাঁচবার লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। গ্রামের অবস্থা আরও বেশি খারাপ।
আজ বেলা ৩টায় সারা দেশে ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়। এদিন দিনের বেলায়ও লোডশেডিং ছিল গড়ে ২ হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার ৬০০ এবং জোগান ১৩ হাজার ৫৩৪ মেগাওয়াট হিসাব করে প্রায় ২০ শতাংশ হারে লোডশেডিং হচ্ছিল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৪ আগস্ট দুপুর ১২টায় ঢাকার বিতরণ সংস্থা ডেসকো এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৩৯৬ মেগাওয়াট, ওই সময় লোডশেডিং হচ্ছিল ১২০ মেগাওয়াট; ডিপিডিসি এলাকায় চাহিদা ছিল ১ হাজার ৯৯৯ মেগাওয়াট, লোডশেডিং ছিল ১৬৫ মেগাওয়াট। এ ছাড়া পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় চাহিদা ছিল ২ হাজার ৮৪৩ মেগাওয়াট, লোডশেডিং ছিল ৪৩৭ মেগাওয়াট। তবে গতকাল লোডশেডিংয়ের এই চিত্র বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
বিদ্যুতের অভাবে রাজধানী শহরে বিভিন্ন এলাকায় পালা করে দিনে চার থেকে পাঁচবার লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। একবার বিদ্যুৎ গেলে সাধারণত এক ঘণ্টার আগে আসে না। বুধবার পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর ছুটির দিনেও কোথাও কোথাও দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন ছিল। গ্রামের পরিস্থিতি আগে থেকেই ছিল ভয়াবহ। মাঝে কয়েকটা দিন সামান্য স্বস্তি দিয়ে আবারও দিনে ১০-১২ বার করে বিদ্যুৎ যাওয়া শুরু হয়েছে।
দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটা বড় অংশ গ্যাসচালিত। গ্যাসের অভাবে এর অনেকগুলোই বসে আছে। বিদ্যুতের ঘাটতির এটা একটা বড় কারণ। সাগরে ভাসমান মার্কিন এলএনজি টার্মিনাল মেরামত হলেও আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ খুব একটা বাড়েনি। ফলে বিগত এক মাসের মতোই গ্যাসের সরবরাহে ঘাটতি বিরাজ করছে।
পেট্রোবাংলা ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য গ্যাসের বরাদ্দ ৯৪০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমিয়ে ৮৯০ মিলিয়ন ঘনফুটে নামিয়ে আনা হয়েছে। স্বল্প জোগানের বাকি গ্যাস দেওয়া হচ্ছে বাণিজ্যিক গ্রাহক ও সার কারখানায়।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াট হলেও গত কয়েক সপ্তাহে তা ৫ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের মধ্যে রাখা হয়েছিল। উৎপাদন আরও কমিয়ে ৫ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নামিয়ে আনা হয়েছে। অন্যদিকে ব্যয়বহুল ফার্নেস তেলে পরিচালিত বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ২ হাজার মেগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট করা হয়েছে।
গ্যাসের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা হচ্ছে
গতকাল পেট্রোবাংলার পরিচালন বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী মু. শোয়েব আজকের পত্রিকাকে বলেন, তাঁরা ধীরে ধীরে এলএনজি সরবরাহ বাড়িয়ে গ্যাসের ঘাটতি পূরণ করার চেষ্টা করছেন। এর মধ্যে সূচি অনুযায়ী এলএনজি কার্গো সরবরাহের ক্ষেত্রেও কিছুটা ঘাটতি রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে কাতার ও ওমানের সঙ্গে থাকা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির এলএনজি কার্গোগুলো সময়মতো দেশে আসছে না। ফলে চড়া দামে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। সবশেষ কেনাকাটায় প্রতি ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজির দাম পড়েছে প্রায় ২৪ ডলার, যা যুদ্ধ শুরুর আগে ১২ থেকে ১৩ ডলারের মধ্যে ছিল। আর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে কেনা এলএনজি পাওয়া যাচ্ছিল প্রতি ইউনিট মাত্র ৯ থেকে ১০ ডলার দরে।
জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, বিশ্ববাজার থেকে কেনা প্রতি ঘনফুট এলএনজির দাম পড়ছে প্রায় ৭৫ টাকা। সেই গ্যাস ১৪ টাকা দরে বিদ্যুৎকেন্দ্রে দিয়ে উৎপাদন সচল রাখতে হচ্ছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় গ্যাসে এক বছরের ভর্তুকি বরাদ্দ গত দুই মাসেই খরচ হয়ে গেছে। সরকার এখন কম দামে বিদ্যুৎ পাওয়ার উৎস খুঁজছে।