জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত থেকে দেশে ফেরার ঘোষণার পর রাজনৈতিক সহিংসতার আশঙ্কা করছে পুলিশ। এ জন্য সব ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা এড়াতে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি এবং এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়াতেও বলা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর ১৮ আগস্ট সব ইউনিটকে এসব নির্দেশনা দিয়ে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে রাজনৈতিক সহিংসতার আশঙ্কা জানিয়ে ইউনিটগুলোকে তা মোকাবিলায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এরপর ২২ আগস্ট একই ধরনের নির্দেশনা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) বিভিন্ন বিভাগেও পাঠানো হয়।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সদর দপ্তরের ওই চিঠিতে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে সহিংসতার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠিতে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের সন্দেহভাজন নেতা-কর্মীদের নজরদারিতে রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন মামলার পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার এবং জামিনে থাকা ব্যক্তিদের গতিবিধির বিষয়ে খোঁজখবর রাখতে বলা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে আগাম তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিতেও নির্দেশ দেওয়া হয়।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সতর্কতামূলকভাবে আগাম তথ্য সংগ্রহ করছে। মাঠপর্যায়ের পুলিশকে এসব বিষয়ে অবহিত করে সতর্ক থাকার ওপর জোর দেওয়া পুলিশের নিয়মিত কাজ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতন ঘটে আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা সেদিন দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। বর্তমানে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দায়িত্ব নেওয়া বিগত অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির বিচারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের যাবতীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় ২০২৫ সালের মে মাসে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। ২০২৬ সালের এপ্রিলে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া আইনের মাধ্যমে তা স্থায়ী বৈধতা লাভ করে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করা হয়।
এদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি। রাজউকের পূর্বাচলে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির দায়েও তাঁর কয়েক বছরের কারাদণ্ড হয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে এক অডিও সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তিনি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। তাঁর সঙ্গে দেশের বাইরে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতারা ও দেশে থাকা নেতা-কর্মীদের প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তথ্য রয়েছে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার এই ঘোষণার বিষয়ে আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ কখনো গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের গ্রহণ করবে না। বিদেশে বসে আওয়ামী লীগ দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। সরকার এসব বিষয়ে নজর রাখছে।
পুলিশের সূত্র জানায়, পুলিশের গোয়েন্দারা তথ্য পেয়েছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী এবং অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে গোপনে সংঘবদ্ধ হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনার দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে মিছিল ও বিভিন্ন কর্মসূচির প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আশঙ্কা করছে, এসব কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপির পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা বাড়তে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা বলেন, পুলিশ সদর দপ্তরের ওই চিঠি কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়। গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই আগাম নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যাতে সহিংসতা, নাশকতা, ভাঙচুর, জনদুর্ভোগ বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না ঘটে, সে জন্যই পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটকে বলা হয়েছে।
এদিকে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যানেও রাজনৈতিক সংঘাতের চিত্র উঠে এসেছে। আসকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে ছোট-বড় প্রায় ৪০০টি সংঘাত হয়েছে। এসব ঘটনায় ৭৭ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুর্বৃত্তদের হামলা ও গুলিতে নিহত হয়েছেন ৪০ জন।
পুলিশের সূত্র বলেছে, এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে রাজনৈতিক সহিংসতার আশঙ্কাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে পুলিশ।
অপরাধ ও নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌহিদুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, পুলিশের এই আশঙ্কার বাস্তবতা রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, অর্থের বিনিময়ে অপরাধ সংঘটিত করানোর প্রবণতাও বাড়ছে। তিনি বলেন, দেশের ভেতরে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সরকারকে চাপে ফেলার চেষ্টা করতে পারে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। তবে রাজনৈতিক বিষয় শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ছেড়ে দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করলে তা কার্যকর নাও হতে পারে। রাজনৈতিক সংকট নিরসনে রাজনৈতিক উদ্যোগও প্রয়োজন।