ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গণ-আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি আবারও জোরালোভাবে জানাচ্ছে। তবে ভারতের শীর্ষস্থানীয় সরকারি কর্মকর্তারা বলেছেন, এ ধরনের অনুরোধ ভারতীয় বিচারব্যবস্থার সামনে উপস্থাপন করতে হবে এবং এর সিদ্ধান্তও নিতে হবে আদালতকেই।
তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ‘ম্যাক্সিমালিস্ট’ বা কোনো সমঝোতা বা ছাড় না দিয়ে নিজেদের সমস্ত লক্ষ্য ও দাবি একবারে শতভাগ আদায়ের চেষ্টার অবস্থান থেকে সরে আসার বিষয়ে ঢাকার সঙ্গে দিল্লির মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
ভারতের এক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশটির সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, ‘প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত আমাদের আদালতই নেবে, এটি কোনো রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত হবে না। আর আদালতের প্রক্রিয়ায় যেটি প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, তা হলো—যে অপরাধগুলো করার অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো ভারতের আইনেও অপরাধ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ কি না।’
অপর এক কর্মকর্তাও বলেন, শেখ হাসিনা জানিয়েছেন—তিনি চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। গত ৫ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি কবে দেশে ফিরতে চান। জবাবে তিনি ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস, তাই আমি ডিসেম্বর মাসেই ফিরে যেতে চাই।’
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রত্যর্পণের অনুরোধকে দিল্লি ও ঢাকার বর্তমান কূটনৈতিক যোগাযোগ থেকে আলাদা করে দেখা সম্ভব নয়।’
বাংলাদশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তরফ থেকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এর আগে বলেছিলেন, ‘আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখছি। এ বিষয়ে জানানোর মতো কোনো হালনাগাদ তথ্য থাকলে আমি আপনাদের জানাব...।’
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তারা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের পাঠানো শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ-অনুরোধের সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তির বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব আইনি নথিপত্র সংযুক্ত রয়েছে। ঢাকায় ২০২৪ সালের আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে প্রায় দুই বছর ধরে শেখ হাসিনা নয়াদিল্লির একটি অজ্ঞাত স্থানে আশ্রয় ও নিরাপত্তা পেয়ে আসছেন। গত ৫ আগস্ট রাজধানী দিল্লিতে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে তিনি ঘোষণা করেন যে তিনি ‘দেশে ফিরতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ’।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্যরা বলছেন, অনানুষ্ঠানিক আশ্রয়ে থাকা অবস্থায় শেখ হাসিনা বাংলাদেশে তাঁর দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেছেন। তিনি মাঝেমধ্যে সরাসরি বৈঠকও করছেন এবং নিয়মিত টেবিল টেনিস খেলছেন। ৭৮ বছর বয়সী এই নেত্রী বছরের শেষ দিকে ঢাকায় ফেরার পরিকল্পনা করছেন বলেও তাঁরা জানিয়েছেন।
এদিকে এই স্পর্শকাতর ইস্যুতে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়কে ভিত্তি করে ঢাকা শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য চাপ দিয়ে আসছে। ওই রায়ে শেখ হাসিনাকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ করার জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, ভারতে কোনো আদালতে যদি প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত কার্যক্রম শুরু হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ওই রায়কে একাধিক ভিত্তিতে চ্যালেঞ্জ করা হবে। এর মধ্যে অন্যতম হবে, রায়টি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে দেওয়া হয়েছিল এবং তখন সরকারের প্রধান হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্বে ছিলেন। ভারত ২০১৩ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষর করে। ওই চুক্তিতে এমন ব্যক্তিদের ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘বাধ্যবাধকতা’ নির্ধারণ করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, যারা কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন অথবা ‘বিচারিকভাবে ঘোষিত দণ্ড’ কার্যকর করার জন্য যাদের ফেরানো প্রয়োজন।
চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, কোনো প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধের বিষয় থাকলে সেটি সংশ্লিষ্ট ‘অন্য চুক্তিবদ্ধ রাষ্ট্রের বিচারিক কর্তৃপক্ষ’ দ্বারা নিষ্পত্তি করা হবে। চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাজনৈতিক চরিত্রের’ অপরাধ গ্রহণ করা হবে না। তবে একই সঙ্গে এতে ১২টি অপরাধের তালিকা দেওয়া হয়েছে, যেগুলোকে রাজনৈতিক চরিত্রের অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। এসব অপরাধের মধ্যে রয়েছে হত্যা, নরহত্যা, হামলা, আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার, হত্যায় প্ররোচনা এবং আরও কয়েকটি অপরাধ।
এ ক্ষেত্রে ভারতের এক্সট্রাডিশন অ্যাক্ট–১৯৬২ (Extradition Act, 1962)–এর বিধানও গুরুত্বপূর্ণ। ওই আইনে ভারত থেকে পলাতক অপরাধীদের প্রত্যর্পণের বিষয়ে বিস্তারিত বিধান রয়েছে। আইনটিতে বলা হয়েছে, প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত বিষয় পরিচালনার জন্য সিভিপি—কনস্যুলার, পাসপোর্ট ও ভিসা বিভাগ হলো সংশ্লিষ্ট নোডাল বা প্রধান দপ্তর। কোনো প্রত্যর্পণ চুক্তি বা ব্যবস্থার প্রাসঙ্গিক বিধান বিবেচনায় নিয়ে মন্ত্রণালয় বিষয়টি উপযুক্ত মনে করলে, মামলাটি তদন্তের জন্য একজন ইনকোয়ারি ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা যেতে পারে।
আইনে বলা হয়েছে, ‘ইনকোয়ারি ম্যাজিস্ট্রেট যদি মনে করেন যে অনুরোধের ভিত্তিতে পলাতক অপরাধীকে হস্তান্তর করা উপযুক্ত, তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট তাঁর প্রতিবেদনে প্রত্যর্পণের সুপারিশ করতে পারেন।’
অন্যদিকে, ‘প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত তদন্ত শেষে যদি এক্সট্রাডিশন ম্যাজিস্ট্রেট মনে করেন যে বিদেশি রাষ্ট্রের করা প্রত্যর্পণ-অনুরোধের সমর্থনে প্রাথমিকভাবে গ্রহণযোগ্য কোনো মামলা প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তাহলে তিনি পলাতক অপরাধীকে অব্যাহতি দেবেন।’