দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করতে আসিয়ানের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সহযোগিতা আরও জোরদার করবে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। এ লক্ষ্যে মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিম। এ ছাড়া, আসিয়ান জোটের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়টিও এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে মালয়েশিয়া।
আজ সোমবার মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে উপস্থিত হয়ে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দুর্দশা নিরসনে দুই দেশের দৃঢ় অঙ্গীকার রয়েছে। তিনি বলেন, দুই দেশ নিজ নিজ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং আসিয়ান প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে এ সংকট সমাধানে কাজ করবে।
আনোয়ার বলেন, ‘আমাদের যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংকট সমাধানের চেষ্টা করা হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগ এবং আসিয়ান কাঠামোর মাধ্যমে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে সমস্যার অন্তত একটি অংশের সমাধান করার চেষ্টা করা হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসইভাবে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে মালয়েশিয়ার ধারাবাহিক সমর্থনের জন্য দেশটিকে ধন্যবাদ জানান।
তারেক রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতি নিয়ে আমি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি এবং তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসইভাবে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে মালয়েশিয়ার অব্যাহত সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানাই।’ তিনি আরও বলেন, আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশ আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার প্রত্যাশা করছে।
এদিকে, দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আসিয়ানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ব্যাপারে দেশের দৃঢ় আগ্রহ পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ আসিয়ানের ‘সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার’ মর্যাদা অর্জনের উদ্যোগ এগিয়ে নিতে চায়। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশের এই আগ্রহকে স্বাগত জানান এবং আসিয়ান কাঠামোর মধ্যে ঢাকার এই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে গঠনমূলকভাবে সহায়তা দিতে মালয়েশিয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন।
এদিকে, মালয়েশিয়া বাংলাদেশের রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসিইপি) যোগদানের আকাঙ্ক্ষার প্রতিও সমর্থন জানিয়েছে। দেশটি বলেছে, আঞ্চলিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব এবং কৌশলগত ভূমিকাকে তারা স্বীকৃতি দেয়। দুই নেতা মত দিয়েছেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের আরসিইপিতে অংশগ্রহণ আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও শক্তিশালী করবে। বাংলাদেশ পক্ষ এ বিষয়ে মালয়েশিয়ার সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে এবং চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে নিজেদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
চীনের নেতৃত্বাধীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুক্তবাণিজ্য জোট রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি)। ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জোট আসিয়ানের সদস্য ১০টি দেশকে নিয়ে আরসিইপি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে এই চুক্তি কার্যকর হয়। এই জোটের অর্থনৈতিক আয়তন বিশ্বের মোট জিডিপির ৩০ শতাংশ। এর ফলে এই চুক্তি বিশ্বের সবচেয়ে বড় অবাধ বাণিজ্য এলাকা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে যে মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল রয়েছে, সেই অঞ্চল, এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের চেয়েও এশিয়ার নতুন এই বাণিজ্য অঞ্চলের পরিধি বড়।
এর আগে আনোয়ার ইব্রাহিম ও তারেক রহমান দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসেন। বৈঠকে মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ সম্পর্কের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয় এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, সেমিকন্ডাক্টর, জ্বালানি, কৃষি ও শিক্ষা খাতে সহযোগিতা আরও জোরদারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। দুই নেতা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়েও মতবিনিময় করেন।
পরে তাঁদের উপস্থিতিতে সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর এবং সন্ত্রাসবিরোধী গবেষণা, বিনিয়োগ উন্নয়ন ও সহায়তা বিষয়ে দুটি নোট বিনিময় (ইওএন) সম্পন্ন হয়।
ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি ছিল তারেক রহমানের প্রথম দ্বিপক্ষীয় সরকারি বিদেশ সফর। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে তিনি গত রাতে দুই দিনের সরকারি সফরে সেখানে পৌঁছান।
দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের দিক থেকেও সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ১২ দশমিক ১৮ বিলিয়ন মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত বা ২ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে মালয়েশিয়ার রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১০ দশমিক শূন্য ৮ বিলিয়ন রিঙ্গিত বা ২ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার, যার বড় অংশজুড়ে ছিল পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ১০ বিলিয়ন রিঙ্গিত বা ৫০ কোটি ডলার। আমদানিকৃত পণ্যের মধ্যে প্রধান ছিল বস্ত্র, তৈরি পোশাক ও পাদুকা।
২০২৫ সালে বাংলাদেশ বৈশ্বিকভাবে মালয়েশিয়ার ২৮তম বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার ছিল। একই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পর বাংলাদেশ ছিল মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার, দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানির উৎস।