হোম > জাতীয়

বাংলাদেশ-ভারত: ২৪ ঘণ্টা পণ্যবাহী ট্রেন চালু নিয়ে হতে পারে আলোচনা

তৌফিকুল ইসলাম, ঢাকা 

ফাইল ছবি

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ দুই বছরের বেশি সময় ধরে। এই অবস্থায় আগামী ৮-১০ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ইন্টার গভর্নমেন্টাল রেলওয়ে মিটিং (আইজিআরএম)। সেই বৈঠকে যাত্রীবাহী ট্রেন আবার চালুর উদ্যোগের পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টা পণ্যবাহী ট্রেন চালু করার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হবে। এ ছাড়া সীমান্তবর্তী রেল সংযোগ সম্প্রসারণ, চলমান রেল প্রকল্প, আর্থিক দেনা-পাওনা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কারিগরি বিষয় নিয়েও আলোচনা হতে পারে বলে জানা গেছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ও ভারতীয় রেলওয়ের মধ্যে চিঠি চালাচালির মাধ্যমে বৈঠকের তারিখ চূড়ান্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রস্তুতি শুরু করেছে এবং একটি খসড়া আলোচ্যসূচিও তৈরি করা হয়েছে। আলোচ্যসূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে থাকছে বন্ধ থাকা যাত্রীবাহী মৈত্রী, মিতালী ও বন্ধন এক্সপ্রেস পুনরায় চালুর বিষয়টি।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চলতি মাসের শেষ নাগাদ ভারত সফরে যেতে পারেন বলে আলোচনা আছে। সফরটি হলে সেখানে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বন্ধ থাকা ট্রেন পুনরায় চালুর বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করছেন।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ ৯ আগস্ট আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বর্তমান সরকার ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে কাজ করছে এবং বাংলাদেশ রেলের পক্ষ থেকে ট্রেন চালুর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও সক্ষমতা রয়েছে। এখন বিষয়টি দুই দেশের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।’

বাংলাদেশ রেলওয়ে ও ভারতীয় রেলওয়ে বোর্ডের মধ্যে প্রতিবছর আইজিআরএম হতো। তবে ২০২৫ সালের ২০-২২ জানুয়ারি ভারতের নয়াদিল্লিতে সর্বশেষ ৩৭তম আইজিআরএমের পর দেড় বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় কয়েক দফা পেছানোর পর ৩৮তম বৈঠকের দিনক্ষণ ঠিক হয়েছে।

আইজিআরএমের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, আইজিআরএম আগামী ৮ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে। এই বৈঠকে শুধু যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনার বিষয় নয়, দুই দেশের মধ্যে চলাচলকারী পণ্যবাহী ও অন্যান্য ট্রেনের পরিচালনা বা কারিগরি সমস্যা, আন্তদেশীয় রেল সমন্বয় এবং ভাড়া ও আর্থিক দেনা-পাওনার বিষয়গুলোও বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আগে ঢাকা-নিউ জলপাইগুড়ি পথে মিতালী এক্সপ্রেস, ঢাকা-কলকাতা পথে মৈত্রী এক্সপ্রেস এবং খুলনা-কলকাতা পথে বন্ধন এক্সপ্রেস চলাচল করত। তবে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই থেকে এসব ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এর পর থেকে দুই বছরের বেশি সময় আন্তদেশীয় তিনটি যাত্রীবাহী ট্রেন বন্ধ রয়েছে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, এই সময়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে তিন দফা চিঠি পাঠিয়ে ট্রেন পুনরায় চালুর অনুরোধ জানিয়েছে। তবে এখনো কার্যকর কোনো অগ্রগতি হয়নি; কিছু ক্ষেত্রে ভারতীয় পক্ষের আনুষ্ঠানিক উত্তরও পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক পদ পরিবর্তনের পর বাংলাদেশিদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল ভারত। তবে ২৮ জুন ভারত বাংলাদেশিদের জন্য পুনরায় পর্যটন ভিসা চালু করার পর যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর বিষয়ে আলোচনা নতুন করে গতি পেয়েছে।

যেসব বিষয় থাকতে পারে আলোচনায়

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আন্তসরকারি রেলওয়ে বৈঠকের জন্য একটি খসড়া আলোচ্যসূচি প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে মৈত্রী, মিতালী ও বন্ধন এক্সপ্রেস পুনরায় চালু, বন্ধন এক্সপ্রেসে প্রান্ত থেকে প্রান্ত (এন্ড টু এন্ড) ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা চালু এবং পদ্মা সেতু হয়ে মৈত্রী এক্সপ্রেস পরিচালনার প্রস্তাব।

এ ছাড়া রাতে আন্তদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেন চালু, পার্সেল বুকিং সুবিধা, রাজশাহী-কলকাতা রুটে নতুন ট্রেন চালু এবং দুই দেশের মধ্যে পণ্যবাহী ট্রেনের আদান-প্রদান বাড়ানোর বিষয়ও আলোচনায় থাকবে। দর্শনা-গেদে, পেট্রাপোল-বেনাপোল ও রোহানপুর-সিংহাবাদ রুটে সকাল-সন্ধ্যার বদলে ২৪ ঘণ্টা পণ্যবাহী ট্রেন চালু, ওয়াগনের টার্ন অ্যারাউন্ড সময় কমানো ও পণ্যবাহী ট্রেনের কোটা প্রত্যাহারের প্রস্তাবও রয়েছে।

আন্তসীমান্ত রেল সংযোগে আগরতলা-আখাউড়া রেলপথ চালু ও সম্পদ হস্তান্তর নিয়েও আলোচনা হতে পারে। পাশাপাশি রেল কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, বকেয়া পরিশোধ, ওয়াগন রক্ষণাবেক্ষণ এবং ‘রেলযোগে ভ্রমণ’ উল্লেখ করে ভিসা দেওয়ার বিষয়ও আলোচনায় থাকতে পারে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, বাংলাদেশ-ভারত রেল যোগাযোগকে শুধু রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত নয়। এটি মূলত জনগণের সঙ্গে জনগণের সংযোগ; যা চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ট্রানজিট, ট্যারিফ বা প্রাপ্য সুবিধার বিষয়ে বাংলাদেশকে অবশ্যই ন্যায্য ও শক্ত অবস্থানে থাকতে হবে। তবে সেই আলোচনার প্রভাব যেন আঞ্চলিক সংযোগ ও সাধারণ মানুষের চলাচলের ওপর না পড়ে।