হোম > জাতীয়

বিরোধী দলের আপত্তির মুখে এবার সংসদীয় কমিটি থেকেও বাদ গাজী নজরুল

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

গাজী নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামকে সংসদীয় কমিটিতে রাখা নিয়ে জাতীয় সংসদে বিতর্ক হয়েছে। সরকারি প্রতিশ্রুতি কমিটিতে প্রথমে তাঁকে রাখা হলেও বিরোধী দলের আপত্তির কারণে কমিটি পুনর্গঠন করে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়।

আজ সোমবার জাতীয় সংসদে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন। এ কমিটির সভাপতি করা হয়েছে নোয়াখালী-১ আসনের এমপি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনকে। ১০ সদস্যের এ কমিটিতে বিরোধী দল থেকে মাহবুবুল আলম ও নূরুন্নিসা সিদ্দীকাকে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে জি এম নজরুল ইসলামকেও (গাজী নজরুল) রাখা হয়। পরে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়।

কমিটি পাসের পরে ফ্লোর নেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমার জানার বিষয় হচ্ছে, জি এম নজরুল ইসলাম কি বিরোধীদলীয় কোটা থেকে এসেছেন?’

জবাবে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ৩৪৯ জন এমপি এখন সংসদে আছেন। প্রত্যেকেই কোনো না কোনো কমিটিতে, কমপক্ষে একটা কমিটিতে থাকতে পারেন। গাজী নজরুল ইসলামকে আর কোনো কমিটিতে রাখা সম্ভব হয়নি। সরকার যেসব প্রতিশ্রুতি দেবে, সেগুলো এ কমিটি পর্যবেক্ষণ করে, সেই বিবেচনায় তাঁকে এখানে সদস্য রাখা হয়েছে। তাঁকে বিরোধীদলীয় কোটা থেকে কমিটির সদস্য করা হয়নি।

এরপর আবারও ফ্লোর নেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, ‘এতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’

তখন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল চিফ হুইপের উদ্দেশে বলেন, ‘আমার কাছে মনে হচ্ছে, প্রশ্নটা আসছে উনি (গাজী নজরুল ইসলাম) আগে একাধিক স্থায়ী কমিটিতে ছিলেন। বিরোধী দলের অনুরোধে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আবার এখানে রাখা হয়েছে, এ কারণে প্রশ্নটা এসেছে।’

এরপর চিফ হুইপ বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত উনার সদস্যপদ না যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি সব সদস্যকে রাখব (কমিটিতে)। আমি সকলের পক্ষে কথা বলব। সে হিসেবে উনি (গাজী নজরুল) বিরোধী দলেরও না, সরকারি দলেরও না। উনাকে কোনো কমিটিতে রাখা সম্ভব হয়নি। দুটি কমিটিতে উনাকে রাখা হলেও বিরোধী দলের অনুরোধে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আর কোনো কমিটি নাই যে উনাকে রাখা যেতে পারে। বিরোধী দলের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হতে পারে, এ রকম হিসাব করেই জি এম নজরুল ইসলামকে এ কমিটিতে রেখেছি।’

চিফ হুইপ আরও বলেন, ‘আমি চাই, সব সদস্যই অবদান রাখার সুযোগ পাক। এ কমিটির কার্যক্রম খুব বেশি না। হয়তো বছরে একবার-দুইবার বসতে পারে বা পাঁচ বছরে একবার-দুইবার বসতে পারে। আমি মনে করি, উনাকে সদস্য হিসেবে রাখা যেতে পারে, যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁর সদস্যপদ বাতিল না হয়। বিরোধী দলের আপত্তি না থাকলে আমাদের দল থেকেও কোনো আপত্তি নেই।’

তখন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের কোটা থেকে যেহেতু উনাকে সদস্য রাখা হয়নি, সে ক্ষেত্রে আমাদের আপত্তি নেই।’

এরপর ফ্লোর নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, এখানে কনফিউশনের সুযোগ নেই। একজন সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁকে কোনো না কোনো কমিটিতে রাখতে হবে। যেহেতু তাঁর সদস্যপদ এখনো যায়নি, তাই তাঁকে কমিটিতে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, বিরোধী দলের তালিকায় গাজী নজরুলের নাম ছিল না। যে কারণে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোতে তাঁকে রাখা হয়নি। এখন কোনো না কোনো কমিটিতে অ্যাকোমোডেট করতে গিয়ে গাজী নজরুল ইসলামকে রাখতে হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে গাজী নজরুলের নাম আসেনি, সেটা তারা স্বীকার করছে।

গাজী নজরুলের বিষয়ে সিইসি ও স্পিকারকে চিঠি দেওয়ার কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দল থেকে বহিষ্কার করা হলে সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যপদ শূন্য হয় না। নিজ থেকে পদত্যাগ না করলে ৭০ অনুচ্ছেদ আসে না।

বিরোধী দলকে একটা বুদ্ধি দিচ্ছেন জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আপনারা যদি সত্যি সত্যিই চান তাঁর আসনটি শূন্য হোক, তাহলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলের পক্ষে তিনি ভোট দেন নাই। সেই জায়গায় ৭০ অনুচ্ছেদ কিন্তু আসে। এখন সেইটা কগনিজেন্সে (নজরে) নিয়ে যদি আপনারা স্পিকারের মনোযোগ আকর্ষণ করেন, তাঁকে (স্পিকার) চিঠি দেন বা নির্বাচন কমিশনে দেন, বিধি মোতাবেক সাংবিধানিকভাবে সহযোগিতা করতে পারি। এই বুদ্ধিটা বিনা পয়সায় দিলাম।’

পরে আবার ফ্লোর নেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, ‘গ্রামে একটা কথা চালু আছে যে, কোনো দুর্বল মানুষের ওপর প্রতিশোধ নিতে হলে তাঁকে মেম্বার ইলেকশনে দাঁড় করায়ে দেওয়া। আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাঝে মাঝে আমাদের এ রকম কিছু টিপস দেন, আমরা উপভোগ করি। আমি সেদিন বলেছিলাম, উনি থাকলে সংসদ প্রাণবন্ত হয়, সেটি হয় ইতিবাচক, না হয় নেতিবাচক। কিছু একটা হয়।’

বিরোধীদলীয় নেতা আরও বলেন, ‘আমরা এখন তাঁকে (গাজী নজরুল ইসলাম) ফ্লোর ক্রসিংয়ের কথা বলব কেন? আমরা তো তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করেছি। আমরা তো বলতে পারি না, তিনি আমাদের দলের সদস্য হয়ে ফ্লোর ক্রসিং করেছেন, দলের সিদ্ধান্ত ভঙ্গ করেছেন। তবে জাতীয় সংসদের মতো একটি প্রেস্টিজিয়াস হাউসে, যাঁকে আমরা নৈতিক কারণে বহিষ্কার করে চিঠি দিয়েছি, তাঁকে কোনো কমিটিতে না রাখাটাই উত্তম ছিল। এটা নৈতিকতার দিক থেকে উত্তম। তবে এখন এটি পরিবর্তনের সুযোগ আছে। কারণ, বিভিন্ন সময় পুনর্গঠন হয়। তাঁকে কোথাও রাখা না হলে নৈতিকতার দিক থেকে এটা উদাহরণ হবে।’

পরে আবার ফ্লোর নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বিরোধী দলের অবস্থান থেকে বোঝা যাচ্ছে, তারা তাঁর সংসদ সদস্যপদ বহাল রাখতে চায়, কিন্তু কমিটিতে রাখতে চায় না। বিরোধীদলীয় নেতার অনুরোধে ইচ্ছা করলে গাজী নজরুল ইসলামকে কমিটি থেকে বাদ দেওয়া যায়, কমিটি পুনর্গঠন আবার করা যায়। তাঁকে বাদ দেওয়া হলে বিরোধীদলীয় নেতার প্রতি সম্মান দেওয়া হবে। কিন্তু আমরা বুঝে গেলাম, তাঁর (গাজী নজরুল) সদস্যপদ শূন্য করার পক্ষে তিনি নন।’

পরে গাজী নজরুল ইসলামের নাম বাদ দিয়ে কমিটি পুনর্গঠন করা হয়।