রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে সতর্ক হয়েছে পুলিশ। হামলাকারীরা যাতে কোথাও বোমা বা বিস্ফোরক রাখার সুযোগ না পায়, সে জন্য মাঠপর্যায়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। পাশাপাশি উগ্রবাদী ও জঙ্গিবাদী তৎপরতা প্রতিরোধে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর রাজারবাগে বাংলাদেশ পুলিশ অডিটরিয়ামে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিশেষ মতবিনিময় সভায় এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। একই দিন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) জুলাই মাসের অপরাধ পর্যালোচনা সভায় রাজধানীর নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক নির্দেশনা দেন ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ।
সভা সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে পুলিশ। এ পরিস্থিতিতে সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও যানবাহনে তল্লাশি, নিরাপত্তাচৌকি স্থাপন এবং টহল জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সন্দেহজনক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং তাদের চলাচলের ওপর নজরদারি বাড়াতেও বলা হয়েছে।
উগ্রবাদী ও জঙ্গিবাদী তৎপরতা ঠেকাতে বিট ও কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম আরও সক্রিয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি বিবেচনায় পুলিশ সদস্য ও যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও বলা হয়েছে।
গত ২৪ জুলাই রাজধানীর মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি ছাতার ভেতর থেকে বোমা উদ্ধারের পর পুলিশ সদস্যদের সতর্ক করা হয়েছিল। এরপর গত মঙ্গলবার রাতে ১১টি পাইপ বোমাসহ বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার করে ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। এ ঘটনায় মোহাম্মদ আরিফ নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন সাভারের সাধুপুরে একটি প্রেশার কুকারের ভেতর থেকেও আইইডি উদ্ধার করা হয়।
রাজধানীতে ছিনতাই প্রতিরোধেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার। ছিনতাইপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে ক্রাইম বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ডিবি ও সিটিটিসিকে ২৪ ঘণ্টা মাঠে সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি, টহল ও অভিযান জোরদার করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে বলা হয়েছে।
প্রতিটি ছিনতাইয়ের মামলায় সংশ্লিষ্ট থানার ওসি ও ক্রাইম বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ এবং তদন্ত দ্রুত শেষ করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্র উদ্ধারে নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি থানার আশপাশের ঝোপঝাড়, পুকুরসহ সম্ভাব্য স্থানগুলোতে বিশেষ তল্লাশির নির্দেশ দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার।
এ ছাড়া কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি ও মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের তথ্য সংগ্রহ, তাদের চলাচল ও অপরাধের ধরন পর্যবেক্ষণ এবং অপরাধে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। হোটেল ও স্পা সেন্টারে অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধেও নিয়মিত নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আইজিপি পুলিশ সদস্যদের পেশাদারত্ব নিয়েও কঠোর বার্তা দিয়েছেন। গত ১৭ বছর ‘বঞ্চিত’ ছিলেন দাবি করে বিভিন্ন দপ্তরে তদবির করা সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তদবির করে ভালো পোস্টিং পাওয়া যাবে না; মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতার মাধ্যমে নিজেদের প্রমাণ করতে হবে।
পুলিশ সদস্যদের অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে দেশের স্বার্থে ও জনগণের শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করার নির্দেশ দেন তিনি। ইচ্ছাকৃত ভুল বা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন আইজিপি।
তিনি বলেন, রাজধানীতে দেশি-বিদেশি কূটনীতিকসহ সর্বস্তরের মানুষ বসবাস করেন। তাই রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা পুরো দেশের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত অপরাধের পাশাপাশি সাইবার অপরাধ, গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ও মিসইনফরমেশনও পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
দল-মতনির্বিশেষে পুলিশের পরিচয় একটাই—আইন ও জনগণের সেবক। রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও পেশাদারত্ব বজায় রেখে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সদস্যদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশ দেন আইজিপি।