বৃষ্টি কম হওয়ায় পানি কমছে হাওরে। নদীর পানিও নিচে নামছে। আর তাই হাওরাঞ্চলে জাগতে শুরু করেছে এত দিন ডুবে থাকা বোরো ধান। তবে এর বেশির ভাগই পচে গেছে। তার থেকে বেছে বেছে কেটে তোলার চেষ্টা করছেন কৃষকেরা। আর যাঁরা ধান কাটতে যাননি, তাঁরা গতকাল বৃহস্পতিবার কড়া রোদে আগের কাটা ধান শুকাতে ব্যস্ত সময় পার করেছেন।
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার দেখার হাওরপারের আস্তমা গ্রামের কৃষক আক্তার হোসেন বলেন, ‘সারা দিন রোদ থাকায় হাওরে সবাই ব্যস্ত। যা ক্ষতি হওয়ার তো হয়েছেই। আমি কিছু জমি করছিলাম। পানিতে গিয়ে যা আছে, তা তোলার চেষ্টা করছি।’
জামালগঞ্জের হালি হাওরপারের কৃষক আকবর হোসেন বলেন, ‘আমি ৩০ কিয়ারের মতো জমি করেছি। এর মধ্যে ২১ কিয়ারের মতো কাটতে পেরেছি। পানিতে তলানো অবস্থায় কিছু জমি জনপ্রতি দেড় হাজার টাকা করে দিয়ে কাটিয়েছি। ১০ কিয়ারের মতো পাকা ধান পানিতে তলিয়েছে। আজ ভালো করে রোদ ওঠায় ১০ দিন আগের ৮০ মণ ধান শুকাতে পেরেছি।’
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জে হাওরে বৃহস্পতিবার (গতকাল) পর্যন্ত ৭৫ দশমিক ১৬০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত সুনামগঞ্জের নদ-নদীর পানি ৫ সেন্টিমিটার কমেছে। জেলায় বৃষ্টিপাত হয়েছে ১০ মিলিমিটার।
মৌলভীবাজারের হাওরের কৃষকদের দাবি, জেলায় অন্তত ৩০ হাজার কৃষকের ২০ হাজার হেক্টর ধান পচে নষ্ট হয়েছে। হাওরে ধান কাটার শুরুতে তেল সংকটের কারণে আধুনিক কৃষিযন্ত্র কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা সম্ভব হয়নি। আর এতেই তীব্র শ্রমিকের সংকটে পড়েন কৃষকেরা। চোখের সামনে তলিয়ে গেছে ধান, কিছুই করতে পারেননি।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাদিপুর গ্রামের কিষানি জবা রানী বিশ্বাস বলেন, ‘দুচোখে এখন অন্ধকার লাগছে। খাবই কী আর ঋণই দেব কী করে। ঘরে চাল ফুরিয়েছে, এখনই কিনে খেতে হচ্ছে। মাত্র দুই বিঘা ধান ঘরে তুলেছি, রোদের অভাবে পচে চারা গজিয়েছে, তাই বাধ্য হয়ে পচা ধান সেদ্ধ করছেন, যদি কয়েক দিন খাওয়া যায়।’
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, জেলায় ৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমির ধান নিমজ্জিত ছিল। এর মধ্যে ৩ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমির ধান পচে নষ্ট হয়েছে। এতে অন্তত ২০ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পুরোপুরি ক্ষতির সংখ্যা এক-দুই দিনের মধ্যে জানা যাবে।
হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার সুবিদপুর ইউনিয়নের বলাকিপুর গ্রামের কৃষক আফজাল চৌধুরী বলেন, ‘লেবারের কারণে আমরা এখন বিপদে আছি। হবিগঞ্জ জেলার কোথাও শ্রমিক নেই।’
হবিগঞ্জ জেলা কৃষি অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক দীপক কুমার পাল জানান, হাওর ও অন্যান্য এলাকা মিলে জেলায় প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১১ হাজার হেক্টর সম্পূর্ণ তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান জানান, তিন দিন ধরে হবিগঞ্জে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় সব কটি নদীর পানি কমতে শুরু করছে।
কিশোরগঞ্জের হাওরের কৃষকেরা জানান, মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, পচন ধরায় এসব ধান গাছ থেকে ধান সংগ্রহের আর কোনো সুযোগ নেই। এমনকি পচে যাওয়ায় এসব ধানগাছ খড় হিসেবেও ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাদিকুর রহমান বলেন, জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যাওয়া ধানগুলো পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ও গেছে।
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি]