হোম > জাতীয়

‘৩ মিনিটের মধ্যে পায়খানা, প্রস্রাব–গোসল শেষ না করলে মারধর করত’

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

প্রতীকী ছবি

‘টয়লেটে নিয়ে যাওয়ার সময় এক হাতের হ্যান্ডকাফ খুলে দিয়ে বাথরুমের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে দরজা বাইরে থেকে লাগিয়ে দিত। তারপর ভেতরে ঢুকে চোখের বাঁধন খুলে তিন মিনিটের মধ্যে পায়খানা, প্রস্রাব ও গোসল শেষ করতে হতো। তিন মিনিটের বেশি হলে প্রচুর মারধর করত।’

আজ বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ জবানবন্দি দেওয়ার সময় নির্যাতনের এমন বর্ণনা দেন র‍্যাবের আয়নাঘর হিসেবে পরিচিত টিএফআই সেলে গুম থেকে ফিরে আসা ডা. আশিক উল আকবর।

এ ভুক্তভোগী আরও বলেন, তিন মিনিটের মধ্যে কাজ শেষ করে চোখ বেঁধে পেছনে ঘুরে দাঁড়াতে হতো এবং দরজায় নক করতে হতো। তখন তারা দরজা খুলে চোখের বাঁধন চেক করত এবং পুনরায় হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে যেখানে রাখা হতো সেখানে নিয়ে যেতো। সেখানে সারা দিনে মাত্র দুইবার টয়লেটে নিয়ে যাওয়া হতো। এর বেশি যেতে চাইলে মারধর করত। খাবার খাওয়ার সময় এক হাতের হ্যান্ডকাফ খুলে দেওয়া হতো এবং চোখের বাঁধন কিছুটা ওপরে তুলে দিত। পেছনে একজন লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। কেউ খেতে না চাইলে প্রচুর মারধর করত।

গুম হওয়ার সময় ২০১৬ সালে রংপুর প্রাইম মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন ডা. আশিক উল আকবর। যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সঙ্গে।

তিনি জানান, ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের ডাকে তিনি রংপুর থেকে শাপলা চত্বরে এসেছিলেন। শাপলা চত্বরের ঘটনার পরে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাসিনা ও তাঁর ফ্যাসিস্ট সরকার এবং ভারতবিরোধী বিভিন্ন পোস্ট করতেন। বিভিন্ন পোস্টে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার ও ফলো করতেন। ২০১৬ সালের ২৩ মে টঙ্গীতে মামার বাড়িতে থাকাবস্থায় তাঁকে রাত আনুমানিক সাড়ে ৩টার সময় ১০–১২ জন সাদা পোশাকধারী তুলে আনে।

আশিক উল আকবর জবানবন্দিতে বলেন, সেখানে থাকা অবস্থায় তিনি ট্রেন চলাচলের শব্দ শুনতে পেতেন। তাঁকে একদিন জিজ্ঞাসাবাদের রুমে ঢুকিয়ে প্রচুর মারধর করা হয় জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত মর্মে স্বীকারোক্তির জন্য। অস্বীকার করলে হাতে গামছা বেঁধে সঙ্গে একটি হুক লাগিয়ে দেয় এবং একটি মেশিনের মাধ্যমে ঝোলানো হয়। ওজন বেশি থাকার কারণে তার দুই হাতের বগলের নিচের চামড়া ছিঁড়ে যেতে থাকে। তখন পাশ থেকে একজন ফিসফিস করে বলছিল ‘স্যার ও অনেক মোটা মরে যাবে স্যার’। তখন নামিয়ে পুনরায় জঙ্গি সংগঠনের সদস্য হিসেবে স্বীকার করতে বলা হয়। এরপরও অস্বীকার করলে তার দুই কানের লতিতে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয় (এ সময় ট্রাইব্যুনালে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি)।

আশিক বলেন, নির্যাতনের কারণে প্রচণ্ড ভয় তিনি বলেছিলেন, তারা যা বলবে তাই স্বীকার করবে। পরে একটি প্রিন্টেড কাগজ ও একটি সাদা কাগজ দেয়। প্রিন্টেড কাগজ দেখে সাদা কাগজে লিখতে বলে। নির্যাতনের ভয়ে প্রিন্টেড কাগজে থাকা লেখা হুবহু খুব দ্রুত সাদা কাগজে লিখে দেন আশিক। এ সময় তারা তাঁর ফেসবুক আইডি ও পাসওয়ার্ড নিয়ে নেয়। লেখা শেষ হওয়ার পরে তাঁর চোখের রেটিনা, ১০ আঙুলের ছাপ এবং সাদা কাগজে লেখা জবানবন্দির ভিডিও স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়।

সেখানে ভুক্তভোগীকে আনুমানিক ৬০ দিন, ২৪ ঘণ্টা চোখ বেঁধে এবং দুই হাত পেছনের দিকে নিয়ে হাতকড়া পড়িয়ে বেঁধে রাখা হতো। চোখের বাঁধন শক্ত হওয়ায় ডান চোখের রেটিনা ছিঁড়ে যায়। পরবর্তীতে জামিনে বের হওয়ার পরে চোখের অপারেশন করাতে হয় বলেও জানান তিনি।

জবানবন্দিতে আশিক বলেন, আনুমানিক ৬০ দিন পর তাঁকে বলা হয় ছেড়ে দেবে। তাঁকে সেখান থেকে বের করার সময় বুলেট প্রুফ জ্যাকেট পরানো হয়। যাতে র‍্যাব লেখা ছিল। তাঁকে জমটুপির ওপরে একটি হেলমেট পরিয়ে মাইক্রোবাসে করে রওনা দেয় তারা। এক–দেড় ঘণ্টা চলার পরে একটি অজ্ঞাত স্থানে দাঁড়ায় মাইক্রোবাসটি। সেখানে অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর মাইক্রোবাস থেকে নামতে বলে। সে সময় হাতকড়া ও চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়। সে সময় তিনি দেখতে পান অনেক ক্যামেরা তাঁর ছবি তুলছে। সেখান থেকে তাঁকে নিয়ে আবারও রওনা হয় মাইক্রোবাস। পরে তাঁকে, মাহমুদুল হাসান, নাজমুস সাকিব ও শরিয়তুল্লাহ শুভকে র‍্যাব-১ এর মিডিয়া সেন্টারে নিয়ে হাতকড়া ও চোখের বাঁধ খুলে দেওয়া হয়।

তখন সেখানে একটি ব্যাগে করে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, নাট-বল্টু ও বিভিন্ন প্রকার বই ব্যাগ থেকে বের করে একটি টেবিলের ওপরে সাজিয়ে রাখা ছিল। তাদের টেবিলের পেছনে গিয়ে দাঁড়াতে বলা হয় এবং ছবি তোলা হয় বলেও জানান তিনি।

থানায় হস্তান্তরের বিষয়ে আশিক বলেন, তাদের ওই দিনই রাতে টঙ্গী থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। তখন টঙ্গী থানায় থাকা ওসি তাঁর নাম শুনে একজনকে ফোন করে বলে, ‘স্যার মুক্তিযোদ্ধার ছেলে আশিক উল আকবরকে আমরা খুঁজে পাই না, দেখেন স্যার র‍্যাব তাঁকে দুই মাস রেখে এখন মামলা দিতে নিয়ে এসেছে’। ওসি মামলা নিতে অস্বীকার করে। পরবর্তীতে একটি ফোন আসায় তিনি মামলা নেন।

২০১৬ সালের ২১ জুলাই চারজনের বিরুদ্ধে টঙ্গী থানায় একই ঘটনায় তিনটি মিথ্যা মামলা করা হয়। পরদিন তাদের আদালতে উপস্থাপন করে ৭ দিনের রিমান্ড চাওয়া হলে ২ দিন মঞ্জুর হয়। রিমান্ড শেষে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। তারা জেলখানায় থাকা অবস্থায় বিভিন্ন পত্রিকায় সেই ছবি দেখতে পান।

আশিক আরও বলেন, কারাগারে গিয়ে জানতে পারেন তার বাবা গুমের পর র‍্যাবের বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা করেন। পরবর্তীতে র‍্যাব সদস্যরা তাঁকে রিমান্ডে নিয়ে তাঁর বাবার করা অপহরণ মামলা প্রত্যাহার করার জন্য বলে। অন্যথায় বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার করে নির্যাতনের ভয় দেখায়। তবে মামলা প্রত্যাহার না করায় তাঁকে ডেমরা থানা এবং আশুলিয়া থানার দুটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করে।

পরবর্তীতে ২০১৮ সালে তিনি ডেমরা থানার মামলা থেকে চার্জশিটে অব্যাহতি পান। টঙ্গী থানার মামলাটি হাইকোর্ট থেকে ২০১৭ সালে স্থগিত করা হয়। আর আশুলিয়া থানার মামলা থেকে ২০২৬ সালের জুন মাসে আদালতে খালাস পান।

গুমের কারণে আশিকের মেডিকেলে পড়াশোনা তিন বছর পিছিয়ে যায় এবং তিনি ২০২৩ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। তার ওপর হওয়া নির্যাতনের জন্য তিনি ফ্যাসিস্ট হাসিনা, তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারেক সিদ্দিকী, ওই সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং র‍্যাব সদস্যদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।