সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ শতাংশ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ল। সচিব (১ নম্বর গ্রেড) থেকে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন বেড়ে দ্বিগুণ হলো। ১২তম থেকে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ১১৫ শতাংশ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন এই বেতনকাঠামো গতকাল সোমবার বিকেলে মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। প্রায় এক যুগ পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদন করল সরকার।
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়িত হলে সচিব পর্যায়ের বা প্রথম গ্রেডের একজন কর্মকর্তার মূল বেতন বর্তমান ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হবে। ২০তম গ্রেডে কর্মরত ব্যক্তির মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হবে। বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন হলে অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়ার বিষয়টি বিবেচনায় চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরের মধ্যে তিন ধাপে তা বাস্তবায়ন করা হবে।
অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্যও বিশেষ সুখবর রয়েছে নতুন বেতনকাঠামোয়।
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন হলে প্রায় ২৪ লাখ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। এ জন্য সরকারের বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর তথ্য মন্ত্রণালয়ের পিআইডি সম্মেলনকক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে বেতনকাঠামোর বিস্তারিত তুলে ধরেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। তিনি বলেন, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও যৌক্তিক বেতনকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে মন্ত্রিসভা নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন করেছে। ন্যায্যতার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত বিদ্যমান ১: ১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১: ১.৭৮ করা হয়েছে।
নতুন বেতনকাঠামোয় প্রথম গ্রেডের একজন কর্মকর্তার মূল বেতন বর্তমান ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হবে। একইভাবে ২০তম গ্রেডে কর্মরত একজন ব্যক্তির মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, অবসরভোগী পেনশনধারীদের জীবনযাত্রার মান ও বৃদ্ধ বয়সের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে স্ল্যাবভিত্তিক নিট পেনশনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মাসিক ৯,০০০ টাকার কম নিট পেনশন আহরণকারীদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন ১০০ শতাংশ, ৯,০০১ টাকা থেকে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত নিট পেনশন আহরণকারীদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন ৭৫ শতাংশ, ২০,০০১ টাকা থেকে ৩০,০০০ টাকা পর্যন্ত আহরণকারীদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন ৬৫ শতাংশ, ৩০,০০১ টাকা থেকে ৪০,০০০ টাকা পর্যন্ত আহরণকারীদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন ৬০ শতাংশ এবং ৪০,০০১ টাকা বা তদূর্ধ্ব নিট পেনশন আহরণকারীদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন ৫৫ শতাংশ বাড়বে।
এ ছাড়া সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন প্রতি সন্তানের জন্য মাসিক ৩ হাজার টাকা ভাতা প্রাপ্য হবেন। এ ছাড়া ইন্টারনেট ও ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যয় বিবেচনায় মোবাইল ভাতার আওতা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এত দিন শুধু ৫ম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য মোবাইল ভাতা প্রযোজ্য ছিল। জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুযায়ী সব গ্রেডের কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পাবেন।
বাস্তবায়ন তিন ধাপে: সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, গত ১ জুলাই থেকে নতুন জাতীয় বেতন স্কেল সকল কর্চারীর জন্য ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে। বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বল্প আয় বিবেচনায় ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। গত ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে মূল বেতন মোট তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে ভাতা কার্যকর হবে। পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও অনুরূপ ধাপভিত্তিক নিট পেনশন বৃদ্ধি কার্যকর হবে।
নাসিমুল গনি বলেন, জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক কমিটি গঠিত হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস বেতন স্কেল অনুমোদন করা হবে, যা গত ১ জুলাই থেকে জাতীয় বেতন স্কেল, ২০২৬-এর মতো একইভাবে ধাপে ধাপে কার্যকর হবে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সবশেষ অষ্টম বেতনকাঠামো অনুমোদন হয়েছিল ২০১৫ সালে। প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যের ‘নবম জাতীয় বেতন কমিশন’ গঠন করে। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ওই কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের মূল প্রতিবেদন জমা দেয়।
গতকাল মন্ত্রিসভায় নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদনের পর গণমাধ্যমে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রয়োজন বিবেচনায় তাঁরা এটার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। নতুন এই বেতনকাঠামো আরও আগে হওয়া দরকার ছিল। তবে এটার জন্য বেসরকারি খাতে একধরনের চাপ তৈরি হবে, সেটা ঠিক। সেখানেও মূল্যস্ফীতির চাপ আমলে নিয়ে বেসরকারি খাতের সবখানেই এমনকি সংবাদমাধ্যমেও নতুন বেতনকাঠামো হওয়ার দরকার। আবার সরকারি খাতে অপ্রয়োজনীয় লোকবল কমিয়েও আনা যেতে পারে।