হোম > জাতীয়

গ্যাস-সংকটের চাপ জ্বালানি তেলে, বেড়েছে ভর্তুকিও

ফয়সাল আতিক, ঢাকা

গ্যাস-সংকট এবং লোডশেডিং বাড়ায় বিকল্প হিসেবে জ্বালানি তেলের ওপর চাপ বেড়েছে। জ্বালানি তেলের চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অন্তত ৩০ শতাংশ বেড়েছে। ডিজেল ও অকটেনের বিক্রি গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৮ শতাংশের বেশি এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের বিক্রি বেড়েছে প্রায় তিন গুণ।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) থেকে জ্বালানি তেল বিক্রির এসব তথ্য পাওয়া গেছে। বিপিসি বলেছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় এ খাতে ভর্তুকির অঙ্কও বাড়ছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ভর্তুকির পরিমাণ ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি।

বঙ্গোপসাগরে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন, সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির কয়েকটি এলএনজি কার্গো সময়মতো না আসা, পুরোনো মডেলের কার্গো টার্মিনালের সঙ্গে সঠিকভাবে নোঙর করতে না পারাসহ নানা কারণে আগস্টে পরিকল্পনার ১০টি কার্গোর চারটিই আসতে পারেনি। ফলে গত আগস্টে এলএনজি থেকে গ্যাসের সরবরাহ ৪০ শতাংশ কম ছিল। দৈনিক ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে আগস্টে তা ২ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে। স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ হয়েছিল ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এই সংকটের চাপ পড়ে জ্বালানি তেলে।

সূত্র বলেছে, গ্যাস-সংকটের কারণে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় এবং দীর্ঘ সারি থাকায় বিকল্প হিসেবে সিএনজিচালিত যানবাহনে ডিজেল ও অকটেনের ব্যবহার বেড়েছে। শিল্পকারখানাও গ্যাসের অভাবে উৎপাদন চালু রাখতে জ্বালানি তেল ব্যবহার করছে। এ ছাড়া লোডশেডিং বাড়ায় অফিস ও বাসাবাড়িতে ডিজেল-চালিত জেনারেটর ব্যবহার বেড়েছে। সব মিলিয়ে জ্বালানি তেলের চাহিদা বেড়েছে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অন্তত ৩০ শতাংশ।

বিপিসির বিপণন শাখার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্টে দেশে ৩ লাখ ২৩৩ টন ডিজেল বিক্রি হয়েছিল। অথচ চলতি বছরের আগস্টে বিক্রি ২৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৩৫৩ টন। ২০২৫ সালের আগস্টে অকটেন বিক্রি হয়েছিল ৩৪ হাজার ৩৩৬ টন। এ বছরের আগস্টে তা ২৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৪৪ হাজার ৬৫ টন।

তবে পেট্রলের বিক্রি তেমন বাড়েনি। গত বছরের আগস্টে পেট্রল বিক্রি হয়েছিল ৩৩ হাজার ৯৫৪ টন। এ বছরের আগস্টে হয়েছে ৩৫ হাজার ৬৭৪ টন। অর্থাৎ পেট্রলের বিক্রি আগের সময়ের একই সময়ের চেয়ে ৫ শতাংশ বেড়েছে; যা প্রতিবছর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাড়ে।

এ সময়ে সবচেয়ে বেশি বিক্রি বেড়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত জ্বালানি ফার্নেস অয়েলের। গত বছরের আগস্টে সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে ৫৫ হাজার ৯২৫ টন ফার্নেস তেল বিক্রি হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের আগস্টে তা বিক্রি একলাফে তিন গুণ বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৮৯৯ টন। অর্থাৎ গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে ফার্নেস তেল বেশি খরচ হয়েছে।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে গত রোববার বিপিসির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকারকে বিপুল ভর্তুকি দিয়ে বাজারে জ্বালানি সরবরাহ করতে হচ্ছে। বর্তমানে এক লিটার ডিজেল কিনতে সরকারকে ১৯৬ টাকা খরচ করতে হচ্ছে। সেই এক লিটার ডিজেল বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে ১১৫ টাকায়। এভাবে ভর্তুকি দিতে গিয়ে ইতিমধ্যে ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি গেছে। তবে তিনি জানান, পরিস্থিতি যা-ই হোক, বিশ্ববাজার থেকে পর্যাপ্ত তেল কিনে সরবরাহ স্বাভাবিক করার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে বিপিসি।

বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকার গত ছয় মাসে দুই দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। প্রথম দফায় ডিজেলে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন লিটারে ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, পেট্রল লিটারে ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা, অকটেন লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা করা হয়। পরে মে মাসে ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রেখে পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারে ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। বর্তমানে পেট্রল প্রতি লিটার ১৪০ টাকা, অকটেন প্রতি লিটার ১৪৫ টাকা, ডিজেল প্রতি লিটার ১১৫ টাকা এবং কেরোসিন প্রতি লিটার ১৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বিপিসির সূত্র জানায়, বাংলাদেশের তুলনায় প্রতিবেশী দেশগুলোতে আরও বেশি দামে জ্বালানি তেল বিক্রি হচ্ছে। আগস্টে ভারতে প্রতি লিটার ডিজেল ১২৭ টাকা, মালদ্বীপে ১৪০ টাকা, মিয়ানমারে ১৫৯ টাকা, নেপালে ১৬১ টাকা, পাকিস্তানে ১৭৪ টাকা এবং শ্রীলঙ্কায় ১৭৮ টাকায় বিক্রি হয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে দাম আরও বেশি।

তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে

দেশে সরকারি মালিকানাধীন ১৫টি এবং বেসরকারি মালিকানার ৪১টি ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। গ্যাস-সংকট এবং কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো বারবার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকার ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারি কেন্দ্রগুলোর ১ হাজার ১৭৮ মেগাওয়াট এবং বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর ৫ হাজার ৫৪১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।

সাধারণত তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো ১ হাজার ৫০০ থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও এক মাস ধরে তেল পাওয়া সাপেক্ষে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের চেষ্টা করছে। সরকারের কাছে কেন্দ্রগুলোর বেশ বকেয়া রয়েছে। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের জোগান না থাকায় উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছিল না।

বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপপা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত আজকের পত্রিকাকে বলেন, সরকার ইতিমধ্যে বেশ কিছু বকেয়া পরিশোধ করেছে। এসব টাকা দিয়ে ইতিমধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকেরা ফার্নেস অয়েল আমদানির এলসি খুলেছেন। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সেই তেল দেশে এলে উৎপাদন সাড়ে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার মেগাওয়াটে নেওয়া সম্ভব হবে।