পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের নামে প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির মামলায় শেখ হাসিনাকে ৫ বছর, রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিককে ৭ বছর ও শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিককে ২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আজ সোমবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এর বিচারক মো. রবিউল আলম এই রায় ঘোষণা করেন।
এই মামলায় সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিনসহ ১৪ জনকে ৫ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একজনকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
পাঁচ বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য ১২ জন হলেন—গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম সরকার, মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদার, সাবেক সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার, সাবেক অতিরিক্ত সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাবেক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞা, সাবেক সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) তন্ময় দাস, সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, সাবেক সদস্য (উন্নয়ন) মেজর (ইঞ্জি.) সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরী (অব.), সাবেক সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) ফারিয়া সুলতানা, সাবেক পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-২) শেখ শাহিনুল ইসলাম, সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি) মাজহারুল ইসলাম এবং সাবেক উপ-পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি) নায়েব আলী শরীফ।
সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলমকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনা, রাদওয়ান ও টিউলিপসহ দণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেককে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে প্রত্যেককে আরও ৬ মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে বলে রায়ে বলা হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বিশেষ পিপি হাফিজুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গত ১৮ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে রায়ের তারিখ ধার্য করা হয়। এ মামলায় ২৮ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন।
আজ সোমবার বেলা ১১টা ৩৫ মিনিটে রায় ঘোষণা শুরু হয়। আদালত রায়ের সংক্ষিপ্ত অংশ পড়ে শোনান। রায় ঘোষণার সময় কারাগারে থাকা একমাত্র আসামি রাজউকের সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলমকে আদালতে হাজির করা হয়। রায় শেষে সাজা পরোয়ানাসহ তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।
শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য সব আসামি পলাতক রয়েছেন। আদালত সাজাপ্রাপ্ত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার নির্দেশ দেন।
গত বছর ৩১ জুলাই আদালত এ মামলায় শেখ হাসিনাসহ অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।
এর আগে দুদক গত বছর ১২,১৩ ও ১৪ জানুয়ারি শেখ হাসিনা, তাঁর পরিবারের সদস্য ও অন্যদের বিরুদ্ধে ৬টি মামলা দায়ের করে। এরমধ্যে আগে চারটি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। গত ২৭ নভেম্বর তিন মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। তিন মামলায় শেখ হাসিনাকে ২১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দুই মামলার একটিতে শেখ হাসিনার ছেলে জয়কে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও আরেকটিতে মেয়ে পুতুলকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজউকের প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকা অন্যান্যদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আরেকটি মামলার রায় ঘোষণা করা হয় গত ১ ডিসেম্বর। শেখ রেহানার প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির এই মামলায় শেখ হাসিনাকে পাঁচ বছর, শেখ রেহানাকে ৭ বছর ও টিউলিপ সিদ্দিককে দুই বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়। গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজউকের প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকা অন্যান্যদের ৫ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
গত ২৫ মার্চ ছয় মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে দুদক।
রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, সরকারের সর্বোচ্চ পদে থাকাকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ওপর অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক বরাদ্দ পাওয়ার যোগ্য না হওয়া সত্ত্বেও অসৎ উদ্দেশ্যে পূর্বাচল আবাসন প্রকল্পের ২৭ নম্বর সেক্টরের ২০৩ নম্বর সড়কের একটি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের সর্বোচ্চ পদাধিকারী ও পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে বহাল থেকে তাঁর ওপর অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করে, অপরাধজনক বিশ্বাস ভঙ্গ করে প্রকল্পের বরাদ্দ বিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত গণকর্মচারীদের বা রাজউক কর্মচারীদের প্রভাবিত করে রাদওয়ানকে প্লট বরাদ্দ দিয়েছেন। শেখ রেহানার কন্যা টিউলিপ সিদ্দিক তাঁর ভাইকে প্লট বরাদ্দে বিশেষ ক্ষমতা বলে প্রত্যক্ষ প্রভাব খাটিয়েছেন। অন্যদিকে রাজউকের প্রকল্প বরাদ্দ বিষয়ক কর্মচারীরা নিজেরা লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে নিয়ম বহির্ভূতভাবে প্লট বরাদ্দ দিয়েছেন।
রায়ে যা বলা হয়েছে:
আদালত রায়ে বলেছেন, শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের রাজধানীতে আবাসন সুবিধা থাকা সত্ত্বেও তিনি মিথ্যা হলফনামা দাখিল করে রাজউকের প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন। আর এই প্লট বরাদ্দে প্রভাব খাটিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্লট বরাদ্দ প্রক্রিয়ার সব আইন বিধি-বিধান লংঘন করে ক্ষমতার অপব্যবহার করে শেখ হাসিনা তাঁর বোনের ছেলেকে প্লট বরাদ্দ দিতে রাজউককে প্রভাবিত করেছেন। তিনি ফৌজদারি অসদাচরণ করেছেন বলে সাক্ষ্য প্রমাণে প্রমাণিত হয়েছে অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। রাদওয়ান প্লট বরাদ্দ নিয়ে একই ধারায় ও দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় অপরাধ করেছেন। টিউলিপ সিদ্দিক বিদেশে থেকে ফোন করে তাঁর ভাইয়ের নামে প্লট বরাদ্দ নিতে প্রভাব খাটিয়েছেন বলে সাক্ষ্য প্রমাণে প্রমাণিত হয়েছে। ভাইয়ের প্লট বরাদ্দে সহযোগিতার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় সাজা দিয়েছেন আদালত। অন্য আসামিরা সরকারি কর্মচারী হয়ে সরকারি কর্মচারী আইন এবং বরাদ্দ সংক্রান্ত আইন ও বিধি-বিধান লংঘন করেছেন। তাঁরা সকলেই ফৌজদারি অসদাচরণ করেছেন বলে প্রমাণ হয়েছে। এদের সবাইকেও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ও দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় সাজা দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে দুটি অপরাধে মৃত্যুদণ্ড ও একটি অপরাধে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গত বছর ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল এই রায় ঘোষণা করেন।