বিএনপির দুঃসময়ের কান্ডারি ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এবার তিনি হলেন রাষ্ট্রের কান্ডারি। দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে গতকাল শুক্রবার শপথ নিয়েছেন তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এবার তাঁর নতুন অধ্যায় শুরু হলো বঙ্গভবনের বাসিন্দা হিসেবে।
বঙ্গভবনের ঐতিহাসিক দরবার হলে গতকাল সন্ধ্যায় নতুন রাষ্ট্রপতিকে শপথ পাঠ করান জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল। শপথ অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকা স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য ও বিদেশি কূটনীতিকেরা উপস্থিত ছিলেন।
নতুন রাষ্ট্রপতিকে শুভেচ্ছা জানাতে বঙ্গভবনে এসেছিলেন তাঁর পরিবারের সদস্যরাও। বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ, ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ, বড় মেয়ের স্বামী ফাহাম আব্দুস সালাম এবং ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিন ও মির্জা ইকবাল আমিন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
অতিথিদের সারিতে ছিলেন তিন বাহিনীর প্রধান—সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিমান- বাহিনীর প্রধান হাসান মাহমুদ খাঁন ও নৌবাহিনীর প্রধান খোন্দকার মিজবাহ উল আজীম। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও সেলিমা রহমান, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য বরকতউল্লা বুলু, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেলসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারাও অনুষ্ঠানে ছিলেন।
আওয়ামী লীগের আমলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পাওয়া মো. সাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন। এর প্রায় চার সপ্তাহ পর নতুন রাষ্ট্রপ্রধান পেল বঙ্গভবন। মাঝের সময়টাতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ভোটাভুটির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন বিএনপির সদ্য সাবেক মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে আসা মির্জা ফখরুল। দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পরে রাষ্ট্রপতি পদে এ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ভোট পান ২৫৫টি। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদের বাক্সে পড়ে ৮৮ ভোট।
শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গতকাল সন্ধ্যা ৭টার দিকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গাড়িবহর বঙ্গভবনে প্রবেশ করে। এরপর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ দরবার হলে প্রবেশ করেন তিনি।
দরবার হলের মঞ্চে তিনটি আসন ছিল। মাঝের আসনে বসেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তাঁর ডানের আসনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বাঁয়ে ছিলেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল। তাঁরাসহ অনুষ্ঠানের অতিথিরা নিজেদের আসন থেকে উঠে দাঁড়ালে ব্যান্ডদলের সদস্যরা বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে জাতীয় সংগীত বাজান। এরপর আসন গ্রহণ ও শপথ অনুষ্ঠান শুরুর অনুমতি প্রার্থনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করা হয়। এরপর মন্ত্রিপরিষদ সচিব শপথ পাঠ করানোর জন্য অনুরোধ জানান। তখন রাষ্ট্রপতিকে শপথ পাঠ করান ভারপ্রাপ্ত স্পিকার। শপথ পাঠ শেষ হলে শপথনামায় সই করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শপথনামা সত্যায়িত করেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার।
শপথে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সশ্রদ্ধচিত্তে শপথ বা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করিতেছি যে, আমি আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের কর্তব্য বিশ্বস্ততার সহিত পালন করিব। আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করিব। আমি সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করিব। আমি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া সকলের প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহীত আচরণ করিব।’
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল শপথ নেওয়ার পর হাফিজ উদ্দিন তাঁকে মাঝের আসন ছেড়ে দিয়ে ডানের আসনে বসেন। মাঝের আসনে বসেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল। এর কিছুক্ষণ পর হাফিজ উদ্দিন ও কায়সার কামাল মঞ্চ ছেড়ে উঠে যান। তখন শুরু হয় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের শপথ অনুষ্ঠান। প্রথমে চার মন্ত্রীকে এবং পরের ধাপে দুই প্রতিমন্ত্রীকে শপথ পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
নতুন রাষ্ট্রপতি কাল রোববার বঙ্গভবনে উঠবেন বলে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় জানিয়েছে। সেদিন সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে তিনি মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবন থেকে বঙ্গভবনের উদ্দেশে রওনা করবেন বলে জানা গেছে।
রাষ্ট্রপতির কার্যালয় জানিয়েছে, রোববার বঙ্গভবনে ২ নম্বর গেটে পৌঁছানোর পর রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে পুলিশের একটি সুসজ্জিত দল ‘গার্ড অব অনার’ মঞ্চে নিয়ে যাবে। সেখানে রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার দেবে। এ পর্ব শেষে রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনে তাঁর কার্যালয়ে যাবেন।
রাষ্ট্রপতি কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আজ শনিবার সকাল সাড়ে ৯টায় জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে যাবেন নতুন রাষ্ট্রপতি। সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করার পর তাঁকে তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার দেওয়া হবে। শ্রদ্ধা জানানোর পর রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মিন্টো রোডের বাসায় ফিরবেন। এরপর তিনি তাঁর গুলশানের বাসভবনে যেতে পারেন।
গতকাল দুপুরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এদিন তিনি জুমার নামাজ পড়েন বেইলি রোডের স্টাফ কোয়ার্টার জামে মসজিদে। সেখান থেকে ১টা ৪৬ মিনিটে সরাসরি যান শেরেবাংলা নগরে জিয়া উদ্যানে জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সমাধি প্রাঙ্গণে। সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে ফাতিহা পাঠ ও মোনাজাত করেন। এ সময়ে বিএনপির সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান রতন ও রাষ্ট্রপতির সহকারী একান্ত সচিব ইউনুস আলী উপস্থিত ছিলেন।