ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ঝুঁকিপূর্ণ (অতি গুরুত্বপূর্ণ) হিসেবে চিহ্নিত ভোটকেন্দ্রগুলোকে বিশেষ নজরদারিতে আনা হচ্ছে। এসব কেন্দ্রের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি সিসি ক্যামেরা বা বডি-ওর্ন ক্যামেরা, ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
ইসি সূত্র বলেছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন সামনে রেখে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশজুড়ে সমন্বিতভাবে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে ইসি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর। এর অংশ হিসেবে সহিংসতা ও নাশকতার আশঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ভোটকেন্দ্রগুলোকে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনা হবে। সারা দেশের মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২৫ হাজার ৮৪৭টি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
জানতে চাইলে গতকাল বুধবার নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার আজকের পত্রিকাকে বলেন, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে সাধারণ কেন্দ্রের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেশিসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হবে। এসব কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা থাকবে। যেখানে সিসি ক্যামেরা বসানো সম্ভব হবে না, সেখানে বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে পরিস্থিতি অনুযায়ী কোথাও বিজিবি, কোথাও সেনাবাহিনী কিংবা বিমানবাহিনীর সদস্যদের টহল ও মুভমেন্ট থাকবে। নির্দিষ্ট সময় অন্তর এসব বাহিনীর সদস্যরা কেন্দ্র পরিদর্শন করবেন, যাতে কোনো ধরনের সহিংসতা বা দুর্ঘটনা না ঘটে।
ইসির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫১, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৪ এবং তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ভোটার ১ হাজার ১২০ জন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২ হাজার ১৭ জন প্রার্থী।
পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র জানায়, নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন থাকবেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১ লাখ, নৌবাহিনীর ৫ হাজার, বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০, পুলিশের ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৩, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৩৭ হাজার ৪৫৩, কোস্ট গার্ডের ৩ হাজার ৫৮৫, র্যাবের ৭ হাজার ৭০০ এবং ফায়ার সার্ভিসের ১৩ হাজার ৩৯০ জন সদস্য থাকবেন।
সূত্র আরও জানায়, সারা দেশের মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট গ্রহণ করা হবে। এসব কেন্দ্রে ২ লাখ ৬০ হাজারের মতো ভোটকক্ষ থাকবে। ভোটকেন্দ্রগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ ও সাধারণ কেন্দ্রে ভাগ করে নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ভোটকেন্দ্রগুলোর মধ্যে ২৫ হাজার ৮৪৭টি ঝুঁকিপূর্ণ (অতি গুরুত্বপূর্ণ) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি ১৬ হাজার ৯৩২টি সাধারণ ভোটকেন্দ্র। অতি গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের অনেকটিতে ইতিমধ্যে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ-সংযোগহীন ২৯৯টি কেন্দ্রে বিদ্যুৎ-সংযোগ দেওয়ার কাজ চলছে।
নির্বাচন সামনে রেখে সার্বিক নিরাপত্তা প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে গতকাল পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) বাহারুল আলম বলেন, নির্বাচনের আগে ভোটার ও প্রার্থীদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে আস্থার সংকট যেন সৃষ্টি না হয়, সেদিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সে অনুযায়ী সব নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র জানায়, পুলিশের ঢাকা রেঞ্জ ও চট্টগ্রাম রেঞ্জে ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ঢাকা রেঞ্জে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ৪ হাজার ৫৬৪ এবং চট্টগ্রাম রেঞ্জে রয়েছে ৫ হাজার ১৭২টি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ভোটের দিন অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে তিন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে দুই এবং সাধারণ কেন্দ্রে একজন করে পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। পুলিশের পাশাপাশি প্রতিটি কেন্দ্রে ১০ জন আনসার সদস্য ও একজন সহকারী সেকশন কমান্ডার দায়িত্ব পালন করবেন। প্রিসাইডিং কর্মকর্তার নিরাপত্তায় একজন অস্ত্রধারী আনসার সদস্যও থাকবেন। বডি-ওর্ন ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও তাৎক্ষণিকভাবে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হবে। পুলিশের সদস্যদের ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে পূর্ণ পোশাক, অস্ত্র ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটসহ নিজ নিজ জেলায় রিপোর্ট করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ওই কর্মকর্তারা আরও জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে মোট ২৫ হাজার ৫০০ বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। এর মধ্যে ১৫ হাজার ক্যামেরা লাইভ স্ট্রিমিংয়ে সক্ষম এবং বাকি ১০ হাজার ক্যামেরা অফলাইনে ভিডিও ধারণ করবে। ধারণ করা এসব ভিডিও পরবর্তী সময়ে যাচাইয়ের জন্য ব্যবহার করা হবে। প্রতিটি জেলার পুলিশ সুপার বডি-ওর্ন ক্যামেরা বিতরণ ও ব্যবহার তদারকি করবেন। এ ছাড়া নিরাপত্তা জোরদারে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে থাকবে ৫০০ ড্রোন ও প্রায় ৫০টি ডগ স্কোয়াড।
সূত্র জানায়, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোকেও নজরদারিতে রাখা হয়েছে। নির্বাচনের আগে-পরে সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সড়কে যানবাহন চলাচল ঝুঁকিমুক্ত রাখতে টহল জোরদারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল, তল্লাশিচৌকি ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ হয়েছে। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সংঘর্ষের মাত্রাও বাড়তে পারে। তাই সংঘর্ষ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এমন এলাকায় বাড়তি নজরদারি করা হচ্ছে। ভোটের দিন যাতে বড় ধরনের সংঘর্ষ বা অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সেদিকেও লক্ষ্য রাখা হবে।
সূত্র জানায়, প্রার্থীদের নিরাপত্তাও বাড়ানো হয়েছে। বেশ কয়েকজন প্রার্থীকে গানম্যান দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সূত্র জানায়, ভোটের দিন ঢাকা মহানগরের ২ হাজার ১৩১টি ভোটকেন্দ্রে প্রায় ২৫ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবেন। চারটি স্থানে নিয়ন্ত্রণকক্ষ স্থাপন করে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নজরদারি করা হবে। ঢাকার ১৫টি স্থানে ব্যালট ও ব্যালট বাক্স সংরক্ষণ করা হবে। ভোটকেন্দ্রে সামগ্রী পৌঁছানো ও ফেরত আনার জন্য তিন হাজার যানবাহন রিকুইজিশন করা হয়েছে। ঢাকা মহানগরে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা ১ হাজার ৮৩১টি।
জানতে চাইলে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) ফারুক হোসেন বলেন, ভোটের আগে, ভোটের দিন এবং ভোটের পরে—এই তিন ধাপে পৃথক নিরাপত্তা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রগুলোর অবস্থান ও ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনা করে এ পরিকল্পনা করা হয়েছে। রাজধানীর প্রতিটি ওয়ার্ডে নিয়ন্ত্রণকক্ষ স্থাপন করা হবে। অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।