হোম > জাতীয়

স্থায়ী কমিটির বৈঠক

সারের পর্যাপ্ত মজুতের তথ্যে সংসদীয় কমিটিতে দ্বিমত, মাঠপর্যায়ে সংকটের অভিযোগ এমপিদের

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

ফাইল ছবি

দেশে পর্যাপ্ত সারের মজুত রয়েছে বলে কৃষি মন্ত্রণালয় দাবি করলেও সংসদীয় কমিটির বৈঠকে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সরকার ও বিরোধী দলের একাধিক সংসদ সদস্য (এমপি)। তাঁরা জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয়ের কাগজ-কলমের হিসাবের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মিল নেই এবং তাঁদের নিজ নিজ এলাকায় কৃষকেরা চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না।

আজ বুধবার জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সার সরবরাহ ও বিতরণ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনাকালে এসব তথ্য উঠে আসে। কমিটির সভাপতি শাহাদাত হোসেন সেলিমের সভাপতিত্বে বৈঠকে কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশীদ এবং কমিটির সদস্য শহিদুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান, রোকন উদ্দীন বাবুল, মুজিবুর রহমান চৌধুরী, সাবিরা সুলতানা, গোলাম রছুল ও আবদুল বারী সরদার অংশ নেন।

বৈঠকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে দেশে মোট সারের চাহিদা ৫৮ লাখ ৫০০ টন। চলতি বছরের জুলাই থেকে আজ পর্যন্ত ১২ লাখ ১৯ হাজার টন সার বিতরণ করা হয়েছে। গত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী দেশে সারের মজুত রয়েছে ১২ লাখ ৫৭ হাজার ৯০০ টন, যা গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের (১০ লাখ ৫৮ হাজার ৮০০ টন) তুলনায় বেশি।

বৈঠকসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, বৈঠকে সার মজুত ও বিতরণের এই চিত্র তুলে ধরা হলেও সারসংকট নিয়ে কেউ কেউ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। কমিটির সরকারি দলের একজন ও বিরোধী দলের দুজন সদস্য অভিযোগ করেন, তাঁদের সংসদীয় এলাকায় সারের সংকট আছে। অনেক জায়গায় কৃষক ন্যায্যমূল্যে সার পাচ্ছেন না। আবার কোনো কোনো সদস্য বলেছেন, তাঁদের এলাকায় সারের সংকট নেই। সারের ডিলার নিয়োগ নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী-৪ আসনের এমপি আবদুল বারী সরদার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সারের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে সংকট নেই। যথেষ্ট মজুত আছে। আমরা বলেছি, আপনাদের তথ্য বিশ্বাস করলাম, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। জনগণ সার পাচ্ছে না। এখন কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা, তা চিহ্নিত করার দায়িত্ব সরকারের। যদি সত্যিকার অর্থে সংকট না থাকে, তাহলে কৃষকের সার পাওয়া লাগবে। কেউ কারও ব্যর্থতা স্বীকার করে না, স্বীকার করে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে সমাধান বের করা হলে ভালো হতো।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারদলীয় একাধিক সদস্য জানান, তাঁদের নির্বাচনী এলাকায় সারের সংকট নেই। এর মধ্যে ফরিদপুর-৪ আসনের এমপি শহিদুল ইসলাম বাবুল বলেন, ‘আমার নির্বাচনী এলাকায় সারের সংকট নেই। বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন সারের পর্যাপ্ত মজুত আছে।’

তবে, বৈঠকে একাধিক সদস্য শুধু সংকটের কথা বলেছেন, গুরুতর তেমন কিছুই বলেননি। বিএনপির আরও এক এমপি মৌলভীবাজার-৪ আসনের মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আমি বলেছি, আমার এলাকার সারের কোনো সংকট নেই।’

সার ব্যবস্থাপনা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কমিটির সভাপতি শাহাদাত হোসেন সেলিম। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সারের ঘাটতি নেই। কোথাও কোথাও কিছুটা গুজব ছড়িয়ে একটি পক্ষ ও পালিয়ে যাওয়া সার ডিলারেরা জল ঘোলা করার চেষ্টা করছে। সার পাচারের অভিযোগও আছে।

শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে সারের সংকট নেই। নওগাঁ ও রাজশাহী এলাকায় কিছুটা সংকট আছে বলে বৈঠকে আলোচনায় এসেছে। সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় সংকট থাকলে তা দূর করা, পালিয়ে যাওয়া ডিলারদের শূন্যস্থান পূরণ ও ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বৈঠক শেষে সংসদ সচিবালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় মনিটরিং জোরদার করা, কৃষিবান্ধব সার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ, যশোরের গদখালীতে ফুল গবেষণা কেন্দ্র এবং মৃত্তিকা গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন, পাহাড়, সমতল এলাকাসহ বিভিন্ন পরিত্যক্ত জায়গায় তুলা উৎপাদন, চরের জমিতে ভুট্টা, মিষ্টি আলু, বাদাম চাষ, কৃষিতে সৌরবিদ্যুৎ কাজে লাগানো, কৃষকদের উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনে বিদেশে পাঠানো, কৃষক পর্যায়ে পাটের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি এবং পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করার বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়।

বৈঠকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিগত বছরগুলোর তুলনায় বর্তমানে কৃষক পর্যায়ে বেশি সার সরবরাহ করা হয়েছে। কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশীদ তাঁর বক্তব্যে বলেন, সারের ডিলার নিয়োগে অত্যন্ত স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা হয়েছে। এ লক্ষ্যে ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণসংক্রান্ত নীতিমালা, ২০২৬’ জারি করা হয়েছে।

উপজেলা পর্যায়ে রাসায়নিক সার ও মানসম্মত বীজের সরবরাহ, বিতরণ এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণ তদারকি করার জন্য ‘সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি’ নামে একটি কমিটি রয়েছে। এই কমিটিতে বিরোধী দলের এমপিদের রাখা হয়নি বলেও বৈঠকে দাবি করা হয়। তাঁদের দাবি, নির্বাচনী এলাকার যেকোনো সমস্যার সমাধানে জনগণ প্রথমে তাঁদের কাছে আসে। কিন্তু কমিটিতেই তাঁদের রাখা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে কৃষিমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও কোনো উত্তর দেননি বলে দাবি করেছেন রাজশাহী-৪ আসনে জামায়াতের এমপি আবদুল বারী সরদার।