হোম > জাতীয়

যৌন নিপীড়নের অভিজ্ঞতা জানাতে নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘আওয়াজ ডট বিডি’

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘আওয়াজ ডট বিডি’। ছবি: স্ক্রিনশট

শিশু বয়সে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে চালু হয়েছে ‘আওয়াজ ডট বিডি’ https://awaz.bd/ নামের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। ৭ সেপ্টেম্বর বিকেলে চালুর পর প্রথম দুই দিনে সেখানে ৮১ জন তাঁদের শৈশবের যৌন নিপীড়নের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন।

‘আওয়াজ ডট বিডি’তে জমা পড়া অভিজ্ঞতাগুলোর একটি বড় অংশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকাকালে যৌন নিপীড়নের কথা জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। বিশেষ করে আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসায় শিশুদের নিরাপত্তা, নজরদারি এবং অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কেউ কেউ জানিয়েছেন, বড় শিক্ষার্থী, শিক্ষক বা পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে তাঁরা নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। অনেকের ক্ষেত্রে শৈশবে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনা বড় হওয়ার পরও মানসিকভাবে প্রভাব ফেলছে।

আজ বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্ল্যাটফর্মটিতে জমা পড়া রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, কওমি মাদ্রাসাকে ঘিরে যৌন নিপীড়নের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ৬৫ শতাংশ। কওমি মাদ্রাসায় ১৭টি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। স্কুলে ৮টি ঘটনা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ১টি, আলিয়া মাদ্রাসায় ১টি এবং মসজিদে ৩টি ঘটনার কথা জানানো হয়েছে। কলেজ, মন্দির ও প্যাগোডা নিয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

শিশুদের যৌন নিপীড়নের ঘটনায় অপরাধী বা অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে ভুক্তভোগীর সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ঘনিষ্ঠজনদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। ছেলে ও মেয়ে ভুক্তভোগীদের তথ্য আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

ছেলেশিশুদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ৩৭ শতাংশ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি ছিলেন পরিচিত। বিশ্বস্ত পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে নিপীড়নের ঘটনা ২৮ শতাংশ। নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে ১২ শতাংশ, দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের মাধ্যমে ৭ শতাংশ এবং অন্যান্য ব্যক্তির মাধ্যমে ১২ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে। অপরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে ঘটনার হার ৯ শতাংশ।

মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। তাঁদের ৩৩ শতাংশ ঘটনায় অভিযুক্ত ছিলেন দূরসম্পর্কের আত্মীয়। পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে ১৭ শতাংশ, বিশ্বস্ত পরিচিতের মাধ্যমে ১৬ শতাংশ, নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে ১৭ শতাংশ এবং অন্যান্য ব্যক্তির মাধ্যমে ১৭ শতাংশ নিপীড়নের কথা জানানো হয়েছে। অপরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে ঘটনার হার ৪ শতাংশ।

প্ল্যাটফর্মটির তথ্য বিশ্লেষণ করে আরও দেখা গেছে, নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে ১৪ শতাংশ শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজন ভুক্তভোগীর মধ্যে প্রায় একজনের ক্ষেত্রে পরিবারের ঘনিষ্ঠ পরিসরের কেউ অভিযুক্ত ছিলেন।

ভুক্তভোগীদের বয়স বিশ্লেষণেও একটি নির্দিষ্ট প্রবণতা দেখা গেছে। সবচেয়ে বেশি নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে ১০ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ কৈশোরে প্রবেশের আগের এই বয়সটি শিশুদের জন্য বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে প্ল্যাটফর্মটির তথ্য থেকে ধারণা পাওয়া যায়।

অন্যদিকে, ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রতিবেদন এসেছে ঢাকা জেলা থেকে। সেখানে ১৭টি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে।

প্ল্যাটফর্মটির উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, এসব ঘটনা সামনে আনার উদ্দেশ্য কাউকে হেয় করা নয়; বরং শিশুদের যৌন নিপীড়নের প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে সমাজ ও নীতিনির্ধারকদের সচেতন করা। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্ল্যাটফর্মটির মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশেষ করে ছেলেশিশুদের যৌন নিপীড়নের ঘটনা সামনে আনা। তবে চালুর পর মেয়েরাও তাঁদের শিশুকালের অভিজ্ঞতা জানাচ্ছেন। প্ল্যাটফর্মে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নারী ও পুরুষ—দুই ধরনের ভুক্তভোগীর আলাদা পরিসংখ্যানও প্রকাশ করা হচ্ছে।

ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলে ‘আওয়াজ উঠাও’ বার্তা দেখা যায়। সেখানে বলা হয়েছে, মানুষের দেওয়া বেনামি তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশে, বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুদের যৌন নিপীড়নের প্রকৃত চিত্র বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্ল্যাটফর্মটির দাবি, এখানে নাম, ছবি বা পরিচয় প্রকাশ করা হয় না। ব্যবহারকারীর তথ্য সংরক্ষণ, কুকি বা ট্র্যাকিংয়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়নি।

কেন তৈরি হলো প্ল্যাটফর্ম

‘আওয়াজ ডট বিডি’ তৈরির উদ্যোগের সঙ্গে প্রধানত যুক্ত রাকিবুল হাসান ও সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর। রাকিবুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন এবং বর্তমানে অনলাইন উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন। সালাহউদ্দীন কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল করছেন এবং একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।

রাকিবুল হাসান জানান, তিনি নিজে কওমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন। ফলে মাদ্রাসার পরিবেশ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে। মাদ্রাসাসহ সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট বোর্ডগুলোকে আরও সক্রিয় করার লক্ষ্যেই প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করা হয়েছে। ‘ঘুষ’ বিষয়ে অভিযোগ জানানোর প্ল্যাটফর্ম থেকে তাঁরা অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। মানুষের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে যেভাবে ওই উদ্যোগটি সাড়া ফেলেছে এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, শিশুদের যৌন নিপীড়নের বিষয়েও তেমন সামাজিক চাপ তৈরি করতে চান তাঁরা।

ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ‘আওয়াজ ডট বিডি’ কোনো হেল্প সেন্টার বা আইনি সহায়তা দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়। এটি মূলত সচেতনতা তৈরির একটি প্ল্যাটফর্ম।