ঈদুল আজহা যেন দেশবাসী অত্যন্ত আনন্দঘন, নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন পরিবেশে উদযাপন করতে পারেন, সেজন্য জনসাধারণের প্রতি একগুচ্ছ বিশেষ নিরাপত্তা ও সতর্কতামূলক পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ। যাতায়াত, কোরবানির পশুর হাট, আর্থিক লেনদেন এবং শপিংমলের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে এই দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দেশবাসীকে পুলিশি সেবা নিতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ অথবা নির্দিষ্ট কিছু নম্বরে যোগাযোগের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
আজ বুধবার পুলিশ সদর দফতর থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই নিরাপত্তা গাইডলাইন প্রকাশ করা হয়।
ঈদের ছুটিতে প্রতি বছরই লাখ লাখ মানুষ ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। শেষ মুহূর্তের হুড়োহুড়ি ও অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে পুলিশ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছে:
পরিকল্পিত ভ্রমণ: ট্রেন, বাস, লঞ্চ ও ফেরিঘাটের উপচে পড়া ভিড় এড়াতে ঈদের আগে ও পরে পর্যাপ্ত সময় হাতে রেখে ভ্রমণের পরিকল্পনা করুন।
ছাদ ও ট্রাকে ভ্রমণ নয়: জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে বাস, ট্রেন বা লঞ্চের ছাদে এবং ট্রাক, পিকআপের মতো পণ্যবাহী যানবাহনে যাতায়াত থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন।
গতির চেয়ে জীবন মূল্যবান: যানবাহনের চালককে দ্রুত গাড়ি চালাতে বাধ্য করবেন না। চালক যেন ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং না করে এবং নিয়ম মেনে চলে, সেদিকে আরোহীদেরও নজর রাখতে হবে। কোনো অবস্থাতেই ক্লান্ত, অসুস্থ বা অপেশাদার চালকের হাতে গাড়ি দেওয়া যাবে না।
ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লোকাল যান: মহাসড়কে নসিমন, করিমন, ভটভটি ইত্যাদি ধীরগতির যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবে। একই সাথে ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি রাস্তায় নামানো যাবে না।
নৌপথে সতর্কতা: দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া থাকলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোনো নৌযানে উঠবেন না। দুর্ঘটনা মোকাবিলায় লঞ্চ ও নৌযান মালিকদের অন্তত ১০০-১৫০ ফুট লম্বা দড়ি বিশিষ্ট লাইফ বয়া এবং পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেটের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
অজ্ঞান ও মলম পার্টি থেকে সাবধান: যাত্রাপথে অপরিচিত কোনো ব্যক্তির দেওয়া খাবার বা পানীয় গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকুন। কোনো ব্যক্তিকে সন্দেহজনক মনে হলে সাথে সাথে পুলিশকে জানান অথবা ‘৯৯৯’-এ কল করুন।
পশুর হাটে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং পশুবাহী গাড়িগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে পুলিশ প্রশাসন:
রাস্তায় হাট বসানো নিষিদ্ধ: যানজট ও দুর্ঘটনা এড়াতে কোনো অবস্থাতেই মহাসড়কের ওপর এবং রেললাইনের পাশে কোরবানির পশুর হাট বসানো যাবে না।
চাঁদাবাজি ও অতিরিক্ত হাসিল রোধ: পশুর হাটে শুধুমাত্র সরকার নির্ধারিত হাসিল পরিশোধ করতে হবে। কোনো চক্র অতিরিক্ত হাসিল বা জোরপূর্বক চাঁদা দাবি করলে তাৎক্ষণিকভাবে নিকটস্থ পুলিশ ক্যাম্পে অভিযোগ জানাতে হবে।
পশুবাহী গাড়ির নিরাপত্তা: পশুবাহী ট্রাক বা ট্রলারে অতিরিক্ত পশু বোঝাই করা যাবে না। প্রতিটি পশুবাহী গাড়ির সামনে গন্তব্য বা নির্দিষ্ট হাটের নাম লিখে ব্যানার ঝুলিয়ে রাখতে হবে। কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া পথিমধ্যে পশুবাহী গাড়ি আটকানো যাবে না।
চামড়া পাচার রোধ: ঈদের পর সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে পশুর চামড়াবাহী সন্দেহজনক যাতায়াত কঠোরভাবে নজরদারি করা হবে। চামড়া পাচারের কোনো আশঙ্কা বা তথ্য থাকলে পুলিশকে অবহিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
কোরবানির পশু কেনাবেচার সময় বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের সুযোগ নেয় জালিয়াত চক্র। এ বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে:
ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার: হাটে নগদ টাকা বহনের চেয়ে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে লেনদেন করাকে অগ্রাধিকার দিন।
পুলিশের কারেন্সি এস্কর্ট: বড় অঙ্কের নগদ অর্থ বহন বা স্থানান্তরের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তা বা ‘কারেন্সি এস্কর্ট’ সেবা গ্রহণ করা যাবে।
জাল টাকা শনাক্তকরণ: হাটে টাকা লেনদেনের সময় জাল নোট সম্পর্কে অত্যন্ত সতর্ক থাকুন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ করুন। কোনো নোট নিয়ে সন্দেহ হলে তাৎক্ষণিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাহায্য নিন।
মোবাইল ব্যাংকিং (MFS) নিরাপত্তা: বিকাশ, রকেট, নগদ ইত্যাদির মাধ্যমে লেনদেনের সময় পিন (PIN) বা ওটিপি (OTP) নম্বর কোনো অবস্থাতেই অন্যের সাথে শেয়ার করবেন না।
ঈদের কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে মার্কেট ও শপিংমলগুলোতে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বজায় রাখতে সিসিটিভি ক্যামেরা সচল রাখা, আর্চওয়ে এবং মেটাল ডিটেক্টরের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যেকোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য প্রদান বা তাৎক্ষণিক সহায়তার জন্য নিম্নলিখিত নম্বরগুলোতে যোগাযোগ করার জন্য বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে:
জাতীয় জরুরি সেবা: ৯৯৯ (বিনামূল্যে)
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স কন্ট্রোল রুম: ০১৩২০০০১৩০০, ০১৩২০০০১২৯৯
হাইওয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স (মহাসড়কের তথ্যের জন্য): ০১৩২০১৮২৫৯৮
রেলওয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স: ০১৩২০১৭৭৫৯৮
নৌ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স (নৌপথের নিরাপত্তার জন্য): ০১৩২০১৬৯৫৯৮
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব): ০১৭৭৭৭২০০২৯
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ বাহিনী দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। সকলের একটু সচেতনতাই পারে একটি আনন্দময় ও নিরাপদ ঈদ উপহার দিতে।