হোম > জাতীয়

সংঘাত-প্রতিশোধের রাজনীতি পরিহারের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ফাইল ছবি

সংঘাত, সংঘর্ষ ও প্রতিশোধের রাজনীতি পরিহার করে ভালোবাসা ও সহিষ্ণুতার মধ্য দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জীবনের বিনিময়ে হলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মানুষের অধিকার রক্ষার সংকল্প ব্যক্ত করে তিনি ঠাকুরগাঁওবাসীর উদ্দেশে বলেন, ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক।’

আজ রোববার বিকেলে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের বড় মাঠে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।

প্রতিকূল আবহাওয়া ও মুষলধারার বৃষ্টি উপেক্ষা করে ঠাকুরগাঁওয়ের পাঁচটি উপজেলা এবং পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ ও দিনাজপুরের বীরগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষের উপস্থিতিতে সংবর্ধনাস্থল জনসমুদ্রে পরিণত হয়। রাষ্ট্রপতির সংগ্রামী জীবনের ওপর বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন ও ‘আলোকের এই ঝর্ণাধারায়’ সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। বেলা সাড়ে ৩টার দিকে সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হন রাষ্ট্রপতি।

বক্তব্যের শুরুতেই রাষ্ট্রপতি জুলাই আন্দোলনের ঠাকুরগাঁওয়ের শহীদ পরিবারের সদস্যদের মাঝে আর্থিক অনুদান তুলে দেন। এরপর তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক ত্যাগের বিনিময়ে, অনেক রক্তপাতের মধ্য দিয়ে এই গণতন্ত্র উপার্জিত হতে দেখেছি। শহীদ ও রক্তপাত আমরা আর দেখতে চাই না। সংঘাত নয়, মতবাদের চর্চা হবে আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় জিনিস সহিষ্ণুতা, সেই সহিষ্ণুতা নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।’

ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি জানান, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণ শেষ হয়েছে এবং আগামীকাল সোমবার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে। এ ছাড়া মেডিকেল কলেজের জায়গা চূড়ান্ত হয়েছে, যেখানে আগামী বছর থেকেই শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু হবে। বন্ধ থাকা শিবগঞ্জ বিমানবন্দর পুনরায় চালু, কৃষিভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, যুবসমাজের কর্মসংস্থান তৈরি, মাদকমুক্ত সমাজ গঠন, ৭২ কোটি টাকায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উন্নয়ন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক কার্যালয় ও ইনফরমেশন কমপ্লেক্স নির্মাণের নানা উদ্যোগের কথাও জানান তিনি।

বক্তব্যের একপর্যায়ে রাষ্ট্রপতি স্থানীয় আঞ্চলিক ভাষায় উপস্থিত জনতার উদ্দেশে হাসিমুখে বলেন, ‘মুই জানু তোমরা মোক ভালোবাসেন। সুতরাং যতক্ষণ কাঁথা কোহিম তোমরা শুনিবেন। ঠিক না?’ উপস্থিত জনতা একযোগে ‘হ্যাঁ’ বলে সাড়া দিলে তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন, ‘ক্যাঙ্গাতি আছেন তোমরা বারে? ভালো আছেন তো?’ রাষ্ট্রপতির মুখে ঠাকুরগাঁওয়ের আঞ্চলিক ভাষা শুনে মাঠজুড়ে উচ্ছ্বাস ও করতালির বন্যা বয়ে যায়।

ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা করার বিষয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, রাজবংশী ও সনাতন ধর্মাবলম্বী নৃগোষ্ঠীসহ সবাই এই দেশের নাগরিক। বিভেদ ভুলে সবাইকে একসঙ্গে নাগরিক অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

অনুষ্ঠানে সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রয়াত জিয়াউর রহমান, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া, নিজের মা-বাবা ও শিক্ষকদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি। সংসদ ও তাঁর সাবেক দলকে তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ পদে নির্বাচিত করার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর জনগণের সঙ্গে যোগাযোগটা একটু কমে গেছে। তবে আপনারা ডিসি সাহেবের মাধ্যমে চিঠি পাঠালে আমি অবশ্যই পর্যায়ক্রমে দেখা করব। মনে করবেন না আমি আপনাদের থেকে দূরে চলে গেছি।’

সংবর্ধনা কমিটির আহ্বায়ক ও দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের সাবেক পরিচালক আবু মোহাম্মদ খয়রুল কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, জাতীয় সংসদের হুইপ আখতারুজ্জামান মিয়া, সংসদ সদস্য আবদুস সালাম, জাহিদুর রহমান ও মনজুরুল হক। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ইএসডিওর নির্বাহী পরিচালক ড. শহীদ উজ জামান।

সভাপতির বক্তব্যে আবু মোহাম্মদ খয়রুল কবির রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ‘গণতন্ত্রের কালপুরুষ’ উপাধিতে ভূষিত করেন। বিকেল ৫টা ৪৮ মিনিটে ভালোবাসার ঋণ কখনো শোধ করা যায় না উল্লেখ করে দেশের সার্বিক সমৃদ্ধি কামনার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।