এখন ভাদ্র মাস। এ মাসে তাল পাকে। সেটা এমনি এমনি পাকে না, গরমের তীব্রতার কারণেই পাকে। সেই তাল পাকা গরমে দেশে বেড়েছে লোডশেডিং। ফলে দিনে-রাতে গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। সে সঙ্গে সন্ধ্যা নামার পর লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে অন্ধকার নেমে আসছে দেশের অনেক এলাকায়।
বিদ্যুতের এই বেহাল দশা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে অবশ্য ভাদ্র মাস আসার আগেই, আগস্টের শুরুতে। সে সময় গ্যাসের সংকট তীব্র হয়। ফলে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দিয়েছিল ওই সময়। মাঝে কিছুদিন লোডশেডিংয়ের তীব্রতা কমলেও আগস্টের শেষ দিকে এসে আবারও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বিদ্যুতের ঘাটতি। আজ রোববার বিকেল ৪টার দিকে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৬৩৯ মেগাওয়াট।
এর আগে ৯ আগস্ট দিবাগত রাত ১টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের রেকর্ড হয়। ওই সময় বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) গত দুই দিনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দিনে-রাতে গড়ে দুই থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি থাকছে। মধ্যরাতের দিকে লোডশেডিং ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটে উঠে যাচ্ছে। এটি মোট চাহিদা থেকে প্রায় ২০ শতাংশ কম। ফলে, দেশের অধিকাংশ এলাকার কোথাও না কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকছে।
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, আজ দুপুর ১২টায় সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৭৮ মেগাওয়াট। সে সময় সরবরাহ হচ্ছিল ১২ হাজার ৬৮৮ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট। বিকেল ৪টার দিকে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ বেড়ে ৩ হাজার ৬৩৯ মেগাওয়াট হয়। সন্ধ্যা ৬টার দিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কিছুটা বেড়ে ১২ হাজার ৮৫৪ মেগাওয়াট হয়। এ সময় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে ৫ হাজার ৪৯, তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২ হাজার ২১৮, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৪ হাজার ৫৬০ ও ভারতের আদানি থেকে ১ হাজার ২৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসছিল। এ সময় লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৫৩৯ মেগাওয়াট।
পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাস-সংকটের কারণে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না। জ্বালানিসংকটের কারণে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকেও আশানুরূপ বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে, সরকারি-বেসরকারি তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন বাড়ানোয় জোর দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পিডিবির অনুরোধে গত এক সপ্তাহে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর জন্য অন্তত ২০ হাজার টন ফার্নেস তেল দেওয়া হয়েছে, যা তাদের বার্ষিক সূচির দ্বিগুণ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, গত দুই সপ্তাহ ধরে ঢাকায় গ্রাম ও উপজেলা শহরগুলোর মতো লোডশেডিং করা হচ্ছে। ফলে, আবাসিক এলাকাগুলোয় দিনে তিন-চারবার করে বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। একেকবার গেলে এক ঘণ্টার আগে ফিরছে না। আজ সন্ধ্যার পরপরই রাজধানীর বনশ্রী, খিলগাঁও, মিরপুর, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ চলে যায়। ফলে, একধরনের ভুতুড়ে অন্ধকার নেমে আসে নগরের অনেক এলাকায়।
ইরান যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোয় উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ার পর পিডিবি বলেছিল, তারা কয়লাসহ অন্য কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়াবে। কিন্তু গত কয়েক দিনে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোও কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন দিতে পারছে না। পিডিবির হিসাবে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৮ হাজার ৪২৩ মেগাওয়াট। সেখানে আজ সন্ধ্যা ৬টায় উৎপাদন হচ্ছিল ৪ হাজার ৫৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তিনটি ইউনিটে বর্তমানে উৎপাদন সক্ষমতা ৪৪৪ মেগাওয়াট। কিন্তু সেখানে ইঞ্জিনের সমস্যার কারণে ইভিনিং পিক আওয়ারে (রাত ৯টায়) মাত্র ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। কয়লার সংকটে ভারতের আদানি পাওয়ারের উৎপাদনও কমেছে। সেখানে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও দিনের বেলায় ৯০০ মেগাওয়াট ও রাতে কয়েক ঘণ্টার জন্য ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট উৎপাদন হচ্ছে।
পটুয়াখালীতে আরপিসিএল নরিনকোর যৌথ প্রতিষ্ঠান আরএনপিএল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। সেখানেও কয়লার সংকট রয়েছে। সন্ধ্যায় সর্বোচ্চ উৎপাদন হয় ১ হাজার ১৩০ মেগাওয়াট।
রামপাল ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও কয়লার সংকট রয়েছে। সেখানেও সর্বোচ্চ উৎপাদন ৯২০ মেগাওয়াটের বেশি উঠছে না। মাতারবাড়ী ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সর্বোচ্চ উৎপাদন ৫৫৮ মেগাওয়াট। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে আছে।
সবচেয়ে দক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত পায়রা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রটি মেশিনে সমস্যার কারণে অর্ধেক সক্ষমতায় চলছে। মাত্র ৫১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসছে সেখান থেকে। তবে পূর্ণ সক্ষমতায় ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিচ্ছে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর এসএসপাওয়ার।