ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান- বন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণকাজ প্রায় ৯৯ শতাংশ শেষ হয়েছে। কিন্তু অপারেটর নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় জনবলসংকটের কারণে কার্যক্রম শুরুর বিষয়টি আটকে আছে প্রায় তিন বছর। এ দীর্ঘ দর-কষাকষি, একের পর এক বৈঠক ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে এগোনো যাচ্ছে না।
এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত এই টার্মিনাল চালুর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সচিবালয়ে গতকাল রোববার সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলেছেন তিনি।
বৈঠক শেষে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রী চান দ্রুত সময়ের মধ্যে থার্ড টার্মিনাল চালু করা হোক। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি দ্রুত এগিয়ে নিতে কাজ চলছে।
তবে টার্মিনালটি কবে নাগাদ চালু হবে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, দ্রুত চালুর সম্ভাবনা যাচাই, বিভিন্ন কারিগরি বিষয় এবং পূর্ববর্তী জটিলতা পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মন্ত্রী আফরোজা খানম ছাড়াও অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে আশিক চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, থার্ড টার্মিনাল পরিচালনা ও সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিফ করা হয়েছে এবং তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন।
বিডা চেয়ারম্যান আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ বিষয়ে আগামীকাল (সোমবার) জাপানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথাও জানান তিনি।
থার্ড টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করা হবে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে বিডা চেয়ারম্যান বলেন, এ বিষয়ে এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়। কারণ বিষয়টি সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) পর্যায়ের একটি ইস্যু। বিমান মন্ত্রণালয়ে নতুন মন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েছেন এবং তিনি বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করছেন।
দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের অন্যতম বড় অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালটি পরিচালনা কাঠামো, কারিগরি সমন্বয় ও অপারেটর নিয়োগে জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে এটি ঝুলে আছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর তৃতীয় টার্মিনালের সফট ওপেনিং করা হয়। তবে অপারেটর নিয়োগ সম্ভব না হওয়ায় চালু করা যায়নি টার্মিনালটি।
এ পরিস্থিতিতে অপারেটর নিয়োগে বিকল্প পরিকল্পনা হিসেবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের অনুমতি চেয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর চিঠি পাঠিয়েছে বেবিচক। ৯ ফেব্রুয়ারি বেবিচকের সদর দপ্তর থেকে পাঠানো ওই চিঠিতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলের আওতায় ‘তৃতীয় টার্মিনাল অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স’ প্রকল্প বাস্তবায়নের বিকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের কথা উল্লেখ করা হয়।
চিঠিতে বলা হয়, পিপিপি কর্তৃপক্ষের সাব-ওয়ার্কিং গ্রুপের সঙ্গে চলমান দর-কষাকষি নিষ্পন্ন না হলে ‘প্ল্যান-বি’ প্রস্তুতের বিষয়ে আগেই আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু এ বিষয়ে বৈঠকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় উন্মুক্ত দরপত্রের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
এর আগে তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার জন্য জাপানের সুমিতোমো করপোরেশনের নেতৃত্বাধীন একটি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনা হয়। তবে রাজস্ব বণ্টন, অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত শর্তে মতপার্থক্যের কারণে চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি।
বেবিচক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কনসোর্টিয়ামের কিছু দাবি রাষ্ট্রের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে গ্রহণযোগ্য ছিল না।
তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণে ‘এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি)’ নামে একটি যৌথ কনসোর্টিয়াম কাজ করছে। এতে জাপানের মিত্সুবিশি করপোরেশন, ফুজিটা করপোরেশন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং সিঅ্যান্ডটি করপোরেশন অংশীদার রয়েছে।
এর মধ্যেই টার্মিনাল নির্মাণকাজের অর্থ পরিশোধ নিয়ে নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। বেবিচক ও বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি)’-এর মধ্যে দেনা-পাওনাসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে গঠিত আন্তর্জাতিক সালিসি বোর্ড গত বৃহস্পতিবার বেবিচককে প্রায় ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা সমপরিমাণ অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে।
মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির তিন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত বোর্ডের রায়ে বলা হয়েছে, বিভিন্ন কাজের বিল, রিটেনশন মানি এবং বিলম্বজনিত অর্থায়ন চার্জ বাবদ এই অর্থ পরিশোধ করতে হবে।
প্রকল্পটি ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। টার্মিনাল নির্মাণে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পাশাপাশি নকশাগত ত্রুটির কারণে সিলিং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং টার্মিনালের ভেতরে মোবাইল নেটওয়ার্ক কাভারেজ না থাকার বিষয়টিও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নকশাগত সীমাবদ্ধতার কারণে টার্মিনালের ভেতরে পর্যাপ্ত মোবাইল নেটওয়ার্ক অবকাঠামো স্থাপন করা হয়নি। বর্তমানে জরুরি ভিত্তিতে এ অবকাঠামো স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের মধ্যে বাংলাদেশ সরকার প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বহন করেছে। বাকি অর্থ ঋণ হিসেবে দিয়েছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)। ২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর কাজ শুরু হয়। ২ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এই টার্মিনালে রয়েছে ১১৫টি চেক-ইন কাউন্টার, ৬৬টি ডিপারচার ইমিগ্রেশন ডেস্ক, ৫৯টি অ্যারাইভাল ইমিগ্রেশন ডেস্ক ও ৩টি ভিআইপি ডেস্ক। টার্মিনালটি চালু হলে যাত্রী ধারণক্ষমতা বছরে ৮ মিলিয়ন থেকে বেড়ে ২৪ মিলিয়নে উন্নীত হবে। আর কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা দ্বিগুণ হয়ে বছরে ১০ লাখ টনে পৌঁছাবে।