ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসার পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জনবান্ধব কর্মসূচিগুলো এগিয়ে নিতে কাজ করছিল সরকার। অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষক-শ্রমিকের স্বস্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে নেওয়া হচ্ছে পদক্ষেপ। কিন্তু দেশজুড়ে হঠাৎ করে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে এর অনেক কিছুই যেন বড় পরীক্ষার মুখে পড়ল।
জ্বালানিসংকটের আশু সমাধান নেই বলে জানানো হচ্ছে সরকারের দিক থেকেই। তা-ই যদি হয়, তাহলে এর নানামুখী প্রভাব পড়বে অর্থনীতিসহ জনজীবনের অনেক ক্ষেত্রে। শিল্প-কারখানার উৎপাদন কমবে, নিম্নমুখী হবে রপ্তানি আয়। কমবে কর্মসংস্থান। বেড়ে যাবে জীবনযাত্রার ব্যয়। সংকুচিত হবে নাগরিকের স্বস্তির জায়গা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ মানুষ কথার চেয়ে সরাসরি ফলাফল দেখতে চায়। বাজারে পণ্যের দাম কমছে কি না, কৃষকের আয় বাড়ছে কি না, চাকরি হচ্ছে কি না, হাসপাতালে চিকিৎসা পাওয়া সহজ হচ্ছে কি না, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরেই সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার পাল্লা ঠিক হবে। কিন্তু নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি ও বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ভোগান্তি নিয়ে জনমনে অসন্তোষ এরই মধ্যে সরকারকে পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছে।
এর মধ্যে আরেক টানাটানি শুরু হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে। ভারত খুব করে চাইছে তারেক রহমানের একটি সফর। কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়াসহ কিছু ইস্যুতে বাংলাদেশের দিক থেকে অসন্তোষ আছে। বিরোধী দল এ নিয়ে বেশ উচ্চকিত। তারা বলছে, ভারতের কাছে হাসিনাকে ফেরত আনার বিষয়ে অগ্রগতি না হলে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের প্রয়োজন নেই। কাজেই ক্ষমতার ছয় মাসের মাথায় এসে কূটনৈতিক দিক থেকেও সরকার একটু বেকায়দায় আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ছয় মাস আগে মানুষ এই সরকারকে নিয়ে যে প্রত্যাশা করেছিল, সেই প্রত্যাশার পারদ নামতে শুরু করেছে। সরকার ব্যর্থ হচ্ছে—এটা আমি বলতে চাচ্ছি না। কিন্তু জোর গলায় বলতে পারি সরকার সঠিক পথে এগোচ্ছে না।’
এই বিশ্লেষকের ভাষায়, ‘রেলগাড়ি তো রেল লাইনে চলবে। ধানখেতের ওপর দিয়ে চালানো যাবে না। কাজেই সঠিক পথেই এগোতে হবে।’
অবশ্য এখনই এমন বক্তব্য পুরোপুরি মানতে রাজি সরকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সরকার সঠিক পথেই আছে বলে মনে করছেন তাঁরা। তবে ছয় মাসে সরকারের বিভিন্ন অর্জনে সন্তোষের কথা যেমন বলেছেন, একইভাবে সরকারের সামনে যে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে, সেই বাস্তবতাও স্বীকার করেছেন তাঁরা।
অর্থবছরের শেষ সময়ে ভাঙাচোরা অবস্থার মধ্যে দায়িত্ব নেওয়ার পরও প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকারের যাত্রা মোটামুটি ভালোভাবেই শুরু হয়েছে বলে মনে করেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন। তিনি গতকাল রোববার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা নিজেরা সন্তুষ্ট। কিন্তু আমরা সন্তুষ্ট হলে তো হবে না, সাধারণ মানুষের সন্তুষ্টি দরকার। সেটা অর্জন করতে আমাদের আরও সময় লাগবে।’
সমাজকল্যাণমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি, কর্মসংস্থানসহ সব ক্ষেত্রে উন্নতি করার চেষ্টা করছে সরকার। অর্থনীতিকে টেনে তুলে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা, বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা এবং দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে কাজ চলছে।
সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রমের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার গতকাল সোমবার বলেছেন, ‘সব ক্ষেত্রে আমরা খুব একটা প্রতিকূল অবস্থায় দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। কিছু অগ্রাধিকার প্রকল্প নিয়ে আমরা মাঠে নেমেছি। সরকার সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং ছয় মাস যথেষ্ট সময় না। আমরা পুরোদমে প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় বর্তমান সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত এই সরকারের প্রথম ছয় মাসের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনায় বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সে উন্নতি, বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর উদ্যোগ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজ করার বিভিন্ন পদক্ষেপ, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড এবং ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ। তবে একই সঙ্গে সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে আছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, কর্মসংস্থানের ঘাটতি এবং গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট। বিশেষ করে জ্বালানি সংকট শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদন এবং নতুন বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। আগের সরকারের রেখে যাওয়া ঋণ, আর্থিক অনিয়ম নতুন সরকারের নীতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা সীমিত করছে।
অন্যদিকে চাঁদাবাজি, দখলদারি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ সরকারের জন্য বড় অস্বস্তির কারণ হয়েছে। বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠায় সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিও কিছুটা প্রশ্নের মুখে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ‘মব সংস্কৃতি’ নিয়ন্ত্রণেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি এখনো দেখা যায়নি। ভোটের আগে দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে থেকে যোগ্য, দক্ষ ও মেধাবীদের কাজে লাগানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিএনপি। অথচ এখন সরকারে এসে বিভিন্ন জায়গায় দলীয় লোক বসানোর অভিযোগ আসছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভীর মতে, ছয় মাসে সরকারের অধিকাংশ নির্বাচনী অঙ্গীকার ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়েছে। গত শুক্রবার রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, কোথাও ১০০ শতাংশ, আবার কোথাও ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত লক্ষ্য পূরণ হয়েছে।
গত ছয় মাসে সরকারের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিনির্ভর রাজনৈতিক সংস্কৃতি কমানো, সরকারি ব্যয়ে মিতব্যয়িতা, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ এবং কৃষকসহ নিম্ন আয়ের মানুষের সহায়তা বৃদ্ধি। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফে প্রায় ১৪ লাখ কৃষক ঋণমুক্ত হয়েছেন এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪৩ লাখ কৃষকের জন্য কৃষক কার্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা করা হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, ডিজিটাল ক্লাসরুম, ইন্টার্নশিপ ও শিক্ষার্থী উদ্যোক্তা তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী ও ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ, উপজেলা হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিনা মূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা এবং ই-হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ রয়েছে।
সরকারের অনেক উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি মনে করি না তাদের (সরকার) উদ্যোগগুলো নিষ্ফল হয়ে যাবে। তবে দুর্নীতি একটা বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে নিজের লোকদের দুর্নীতি সরকারকে বড় সংকটে ফেলতে পারে। পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের একটা ব্যর্থতা আছে এই সরকারের। এই ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠাও সরকারের জন্য বড় একটা চ্যালেঞ্জ।’