জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের কয়েকটি কারাগার ভেঙে পালিয়ে যাওয়া অন্তত ৫১৯ জন বন্দীকে দুই বছর পরও গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের মধ্যে ১৮২ জনের পরিচয়ই শনাক্ত করা যাচ্ছে না। নরসিংদী ও শেরপুর কারাগার থেকে পলাতক এই বন্দীদের মামলাসহ অন্যান্য কোনো তথ্য নেই কারা অধিদপ্তরের নথি কিংবা অনলাইন ব্যবস্থায়। ফলে তারা প্রকাশ্যে ঘুরলেও, স্বাভাবিক জীবন যাপন করলেও পলাতক হিসেবে শনাক্ত করার উপায় নেই।
কারা অধিদপ্তরের সূত্র বলছে, পলাতক এই ১৮২ বন্দীর বিষয়ে অনলাইন ব্যবস্থা বা অফলাইন নথি পাওয়া যায়নি। তারা কারা, কোন মামলায় কারাগারে ছিল, সাজাপ্রাপ্ত না বিচারাধীন মামলার আসামি, তা-ও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। শনাক্তহীন এসব বন্দীর দেড় শতাধিক নরসিংদী কারাগারের।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আদালতের নথি ধরে ধরে খোঁজ করলে কারও কারও পরিচয় বের করা সম্ভব হতে পারে। তবে বিপুলসংখ্যক মামলা ও নথিপত্র ঘেঁটে তা বের করা অত্যন্ত কঠিন।
জানতে চাইলে কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন বলেন, পলাতক ছয় শতাধিক কয়েদিকে এখনো কারাগারে ফেরানো যায়নি। তাদের কেউ কেউ হয়তো বিদেশেও পালিয়ে গিয়ে থাকতে পারে। দেশে থাকা পলাতক বন্দীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তবে ১৮২ জনের বিষয়ে কোনো তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি তাদের পরিচয়ও সুনির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না।
কারা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে ও পরে দেশের কয়েকটি কারাগারে বন্দীদের মধ্যে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। পাঁচটি কারাগারে হামলা ও বিদ্রোহের ঘটনায় ২ হাজার ২৪০ জন বন্দী পালিয়ে যায়। এ সময় কারাগার থেকে ৯৪টি আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুলসংখ্যক গুলি লুট হয়। জেল পলাতক বন্দীদের মধ্যে জঙ্গি, মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত, যাবজ্জীবন ও বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদির পাশাপাশি বিচারাধীন মামলার আসামিরাও ছিল।
কারা সূত্র বলছে, কারাগার থেকে পালানোর সময় ১৬ জন বন্দী নিহত হয়। তাদের মধ্যে গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে ছয়জন, জামালপুর কারাগারে সাতজন, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে দুজন এবং চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের একজন রয়েছে। এসব ঘটনায় কারা কর্তৃপক্ষ ছয়টি মামলা করে।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জেল পলাতক বন্দীদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায়। পাশাপাশি শুরু হয় পলাতক বন্দীদের গ্রেপ্তারে অভিযান। তারা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারে, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে পলাতক বন্দীদের তালিকা দেওয়া হয়।
কারা অধিদপ্তরের পদস্থ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আত্মসমর্পণ ও বিভিন্ন অভিযানে গ্রেপ্তারের পরও ৫১৯ জন বন্দীকে এখনো পাওয়া যায়নি। কারাগারে থাকা তাদের ঠিকানায় গিয়ে পাওয়া যাচ্ছে না। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের কেউ কেউ দেশ ছেড়ে থাকতে পারে। তবে পরিচয় শনাক্ত না হওয়া ১৮২ বন্দীর ক্ষেত্রে সমস্যা আরও জটিল।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই হাজারো মানুষ ফটক ভেঙে নরসিংদী জেলা কারাগারে ঢুকে পড়ে। তারা কারাগারের সেল খুলে দেয় এবং বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় ওই কারাগার থেকে ৯ জন জঙ্গিসহ ৮২৬ বন্দী পালিয়ে যায়। হামলায় কারাগারের অফিসের অনলাইন ব্যবস্থাও ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে পলাতক বন্দীদের বিস্তারিত তথ্যের একটি বড় অংশ হারিয়ে যায়। পলাতক বন্দীদের মধ্যে দেড় শতাধিক জনের বিষয়ে কারাগারে কোনো নথিই পাওয়া যায়নি। শেরপুর কারাগারের বন্দীদের তথ্য হারানোর পর শনাক্ত করতে না পারা পলাতক বন্দীর সংখ্যা বেড়ে ১৮২ জনে দাঁড়ায়।
কারা অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেন, কারাগারে যাদের নথিপত্র নেই, তাদের শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে থানায় তাদের তথ্য থাকার কথা থাকলেও হামলা ও অগ্নিসংযোগে সেসব স্থানের অনেক নথিও নষ্ট হয়েছে। তাই এই ১৮২ জনের পরিচয় শনাক্ত করতে একপ্রকার বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে তাদের।
হামলার সময় নরসিংদী ও শেরপুর কারাগার থেকে ৯৪টি আগ্নেয়াস্ত্র ও প্রায় ১০ হাজার গুলি লুট হয়। এর মধ্যে ছিল ৩৩টি চায়নিজ রাইফেল, বিডিএইডের ৩৮টি অস্ত্র ও ২৩টি শটগান। এগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৬৬টি অস্ত্র ও প্রায় ১ হাজার ৮০০টি গুলি উদ্ধার হয়েছে। বাকি ২৮টি অস্ত্র ও প্রায় সাড়ে ৭ হাজার গুলির সন্ধান মেলেনি।
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, কারাগার থেকে পালানো বন্দীরা দীর্ঘদিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির বাইরে থাকা সবার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। যদি পলাতক বন্দীদের পরিচয়ই শনাক্ত করা না গেলে তা অবশ্যই বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়। যেকোনো মূল্যে তাদের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।