হোম > জাতীয়

নতুন সরকার গঠন প্রক্রিয়া, কী বলা আছে সংবিধানে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ফাইল ছবি

চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী এক অস্থির পরিস্থিতিতে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘জুলাই সনদ’ বা সংবিধান সংস্কার-সংক্রান্ত জাতীয় গণভোট। নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী বিএনপি ও তার মিত্রদলগুলো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এখন দেশজুড়ে আলোচনার মূল বিষয়—কবে এবং কীভাবে গঠিত হচ্ছে নতুন সরকার।

সংবিধানের বিধান এবং সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে দেওয়া বিবৃতি অনুযায়ী, ১৭ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই নতুন নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হচ্ছে।

গেজেট প্রকাশ ও সংসদ সদস্যদের শপথের আইনি প্যাঁচ

সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফল ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশনকে তা দ্রুততম সময়ে ‘সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত’ করতে হয়। গেজেট প্রকাশের পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণ বাধ্যতামূলক। শপথ গ্রহণের মাধ্যমেই একজন নির্বাচিত ব্যক্তি আইনগতভাবে ‘সংসদ সদস্য’ হিসেবে গণ্য হন। এরই মধ্যে গতকাল শুক্রবার গভীর রাতে নির্বাচিত ২৯৭ সংসদ সদস্য এবং গণভোটের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে।

শপথ কে পড়াবেন?

সাধারণত বিদ্যমান সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করান। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর সংসদও বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পদ তখন থেকেই শূন্য। এই অবস্থায় সংবিধানের ১৪৮ (২ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দুটি পথ খোলা আছে:

১. রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তি (যেমন প্রধান বিচারপতি) শপথ পাঠ করাতে পারেন।

২. যদি প্রথম তিন দিনের মধ্যে তা সম্ভব না হয়, তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে শপথ পাঠ করাবেন।

সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে বলা আছে—

‘সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হইবার তারিখ হইতে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে এই সংবিধানের অধীন এতদুদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা তদুদ্দেশ্যে অনুরূপ ব্যক্তি কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোনো ব্যক্তি যে কোনো কারণে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পাঠ পরিচালনা করিতে ব্যর্থ হইলে বা না করিলে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার উহার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে উক্ত শপথ পাঠ পরিচালনা করিবেন, যেন এই সংবিধানের অধীন তিনিই ইহার জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি।’

এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ৫ ফেব্রুয়ারি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। সে সময় তিনি জানান, নির্বাচনের পর দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায় সরকার। তিনি বলেন, ‘এটা সরকারের নীতিগত পর্যায়ের সিদ্ধান্ত। আমাদের সামনে দুটি অপশন আছে। একটা হচ্ছে রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তি শপথ গ্রহণ করাতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে হয়তো আমাদের প্রধান বিচারপতি হতে পারেন। আর এটা যদি না হয়, তাহলে আমাদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার আছেন, তিনিই শপথ গ্রহণ করাবেন। এ ক্ষেত্রে একটি সমস্যা আছে, তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে। আমরা আসলে অপেক্ষা করতে চাই না, আমরা নির্বাচন হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করতে চাই।’

সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও সরকার গঠনের ডাক

সংবিধানের ৫৬(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সেই সদস্যকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবেন, যিনি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলে প্রতীয়মান হবেন। বিএনপি এককভাবে ২০০-এর বেশি আসন পাওয়ায় দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকেই রাষ্ট্রপতি সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানাবেন।

‘৩১ দফা’ ও জাতীয় সরকার গঠনের ঘোষণা

নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেলেও বিএনপি এককভাবে সরকার গঠন করবে না বলে আগেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁওয়ে স্পষ্ট করেছেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যারা রাজপথে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করেছে, তাদের নিয়েই একটি ‘ঐকমত্যের জাতীয় সরকার’ গঠিত হবে। একই ইঙ্গিত দিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানও। তবে নিশ্চিত করে কিছুই বলা যাচ্ছে না।

এই সরকারের মূল ভিত্তি হবে বিএনপির ঘোষিত ‘৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাব’। এর মধ্যে রয়েছে:

প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য: এক ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ: উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা প্রবর্তন।

সংসদীয় সংস্কার: ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ দেওয়া হবে বিরোধী দল থেকে।

বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশন: সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিশন গঠন।

মন্ত্রিসভা গঠন ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়া

সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা থাকবে। রাষ্ট্রপতি প্রথমে প্রধানমন্ত্রীকে এবং পরে প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশ অনুযায়ী অন্য মন্ত্রীদের নিয়োগ দেবেন। মন্ত্রিসভার অন্তত নয়-দশমাংশ সদস্য সংসদ সদস্য হতে হবে, বাকি এক-দশমাংশ ‘টেকনোক্র্যাট’ (অনির্বাচিত) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে।

বঙ্গভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নতুন মন্ত্রিসভাকে শপথবাক্য পাঠ করাবেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ইতিমধ্যে নতুন মন্ত্রীদের জন্য দাপ্তরিক প্রস্তুতি ও গাড়ির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে শুরু করেছে।

চূড়ান্ত সময়সূচি: রমজানের আগেই ক্ষমতা হস্তান্তর

সরকারের উচ্চপদস্থ সূত্র ও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের দেওয়া তথ্যমতে, সম্ভাব্য সময়সূচি নিম্নরূপ:

১৫-১৬ ফেব্রুয়ারি: নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ।

১৭-১৮ ফেব্রুয়ারি: প্রধানমন্ত্রীর শপথ এবং নতুন মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণ।

আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের মতে, ১৭ বা ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই, অর্থাৎ পবিত্র রমজান মাস শুরু হওয়ার আগেই নির্বাচিত সরকারের কাছে পূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। এর মাধ্যমেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের বেশি সময়ের শাসনকাল সমাপ্ত হবে এবং বাংলাদেশ একটি নতুন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় প্রবেশ করবে।

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন

নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে অনুষ্ঠিত গণভোটে দেশের মানুষ অভূতপূর্ব সাড়া দিয়েছে। প্রায় ৬৮ শতাংশ ভোট ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষ পড়েছে। ফলে ‘জুলাই সনদ’ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কারে বাধ্য থাকবে নতুন সংসদ। জুলাই সনদ (বা জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫) বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আগামী সংসদ নিয়মিত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রথম ১৮০ থেকে ২৭০ কার্যদিবস একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ বা গণপরিষদ হিসেবে কাজ করবে। এই সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানের ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত হবে।

গণভোটের বিষয়

ক. নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।

খ. আগামী জাতীয় সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।

গ. সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হতে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হয়েছে—সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকবে।’

ঘ. জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত (Note of Dissent)

জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হলেও কয়েকটি বিষয়ে প্রধান দলগুলোর ভিন্নমত ছিল:

বিএনপির আপত্তি: প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা খর্ব করে রাষ্ট্রপতির এককভাবে নিয়োগ প্রদানের কিছু বিষয়ে বিএনপি ভিন্নমত পোষণ করেছে। এ ছাড়া উচ্চকক্ষ গঠন প্রক্রিয়া, ন্যায়পাল ও অন্যান্য সাংবিধানিক পদে নিয়োগের কমিটির কাঠামো নিয়েও তাদের নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে।

জামায়াত ও অন্যান্য দল: আনুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি এবং উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন নিয়ে জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দলের নিজস্ব প্রস্তাব ছিল।

তারেক রহমান, শফিকুর রহমান ও নাহিদ ইসলামের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার ফোনালাপ

মন্ত্রীদের শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি: মন্ত্রিপরিষদ সচিব

সংস্কার বাস্তবায়নে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান ইইউর

অনেকেই শুধু গণভোট দিয়েছেন, সংসদ নির্বাচনে ভোট দেননি: আলী রীয়াজ

‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হওয়ায় ‘নোট অব ডিসেন্ট’-এর কী হবে, যা বললেন আলী রীয়াজ

নতুন বেঞ্চমার্ক স্থাপন করল এই নির্বাচন: ইভারস ইজাবস

মন্ত্রিসভা গঠন ও শপথ প্রক্রিয়া কেমন, কে শপথ পড়াবেন

নাহিদ ইসলামকে প্রধান উপদেষ্টার বার্তা

‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে জনগণ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে, পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরতে চায় না: আলী রীয়াজ

১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সবার শপথ সম্পন্ন হবে: প্রেস সচিব